অপ্রতিমের বাবার ব্যবসার ডেলিভারিম্যান ছিলেন আ'সা'মি ফাহাদ

আপলোড সময় : ২১-০৯-২০২৬ ০১:৪৭:১৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২১-০৯-২০২৬ ০১:৪৭:১৫ অপরাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ শিশুটির বাবার মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান। দুই সপ্তাহ আগে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে তিনি কাজে যোগ দেন। তবে, এখনো তার সঙ্গে চুক্তিপত্র হয়নি।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই ধস্তাধস্তির সময় বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), এরপরই আঘাত করেন ফাহাদ। তারপর মো. কামরুল হাসান (১৬)। তারা দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন। তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল পুলিশকে জানিয়েছেন, আইফোনটি ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে। অপ্রতিমের বাবাও তাই মনে করছেন। তার অন্য কোনো অভিযোগ নেই।

 

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, তার বাবার মোবাইল সরঞ্জামাদির শোরুম রয়েছে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে। নাম ইয়েসটেক। অপ্রতিমের বাসা কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায়। ঘাতক ফাহাদও কাছাকাছি একই এলাকার বাসিন্দা।

 

তিনি জানান, ফাহাদ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকার মমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। তার বাবা অটোচালক। বাবা-মায়ের অনুরোধেই চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ডেলিভারিম্যানের চাকরি দেওয়া হয় তাকে। মাস শেষে তার সঙ্গে চুক্তিপত্র করবেন এমন ইচ্ছাও ছিল অপ্রতিমের বাবার। অপ্রতিমের সঙ্গেও তার ভালো-খারাপ তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না।

 

পুলিশের ভাষ্য, ফাহাদ ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা সবাই বখাটে। অনিয়মিত, কিংবা ঝরে পড়া ছাত্র।

অপ্রতিমের বাবা বলেন, ‘অপ্রতিমও ফাহাদকে খারাপ বলেনি। ভালোই মনে করত। ফাহাদও এ কয়েক দিনে কখনো অপ্রিতমকে খারাপ বলেনি। তাদের পরস্পরের মধ্যে তেমন কিছুই ঘটেনি। তেমন কোনো সম্পর্কও গড়ে ওঠেনি।’ এদিকে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। ফাহাদ অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইছিল।

 

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে থাকতে পারে ফাহাদ। এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।

 

অপ্রতিমের বাবা জানান, হত্যাকাণ্ডের দিন শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে অপ্রতিম আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। তার আগে জুমার নামাজ পড়ে সে বাসায় ফেরে। তিনি তাকে ভাত খাইয়ে দেন। খেয়েই বেরিয়ে পড়ে অপ্রতিম। মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে আনেন তুহিন। এরপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতেও বাসায় না ফেরায় ফাহাদকে ফোন করে ডেকে এনে বিষয়টি জানান অপ্রতিমের বাবা। কোথায় গেছে, খুঁজতেই তাকে আনা হয়। সে তখন তাদের ইন্টারনেট গ্রুপে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি লিখে দেয়। এর মধ্যে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ হাতে আসে অপ্রতিমের পরিবারের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও মায়ের কলিগরা তা সংগ্রহ করেন। সিসিটিভি ফুটেজে যাকে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা গেছে সে কে জানতে চাইলে তুহিনকে দেখামাত্রই সহজেই চিনিয়ে দেন ফাহাদ। চেনার পর ফাহাদকে বলা হয় তুহিনকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতে অপ্রতিমকে দেখেছে কি না, কোথায় গেল। ফাহাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনের কথোপকথনে তুহিন জানায় অপ্রতিম তার কাছে আসেনি। তখন রাত ১০টা বাজে।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে গেছে। পরদিন শনিবার সকালে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী তুহিন ও সন্দেহভাজন অপর গ্রেপ্তার সিয়াম (১৯) মোটরসাইকেলে চড়ে অপ্রতিমদের বাসায়ও আসেন। তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথাও বলে যান। তাদের সান্ত্বনাও দিয়ে যান। পুলিশের ভাষ্য, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হত্যার শিকার হয় অপ্রতিম।

 

অপ্রতিমের বাবা বলেন, শনিবার সকালে বাসায় এসে তুহিন স্বাভাবিক আচরণ করলেও নানা প্রশ্নে একটু রিয়েক্ট করেন সঙ্গে আসা সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার তার বন্ধু সিয়াম।

 

এদিকে শনিবার দুপুরে মরদেহ উদ্ধারের খবর আসার পর ঘটনাস্থলে ফাহাদকে অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে যেতে বললে তার শরীর খারাপ লাগছে বলে সে চলে যায়।

 

কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, পরদিন শনিবার খোঁজখুঁজির সময় অপর ঘাতক কামরুলকে তারা কাছে পাননি। অপর তিনজনকে যেভাবে পেয়েছেন। কামরুলকে চেনেনও না, আগে কখনো দেখেননি। কামরুল তুহিনের বন্ধু। হত্যার আগে তুহিন ফাহাদের মতো তাকেও ডেকে সঙ্গী করে। তুহিন কিশোর গ্যাং লিডার।

 

পুলিশের ভাষ্য, অপ্রতিমকে বাঁশ দিয়ে প্রথমে তুহিন, তারপর আঘাত করেন ফাহাদ ও কামরুল। লালমাই পাহাড়ের নির্জন বনে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসান (১৬)। এছাড়া সিয়ামকে (১৯) সন্দেহভাজন অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা কারাগারে আছেন। বয়স কম হওয়ায় ফাহাদ ও কামরুলকে গাজীপুর সংশোধনাগারে (শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে) পাঠানো হবে।

 

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর। তিনি সদর দক্ষিণ থানার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা (মৈশান বাড়ি) এলাকার নুরে আলম ও শিরিনা আক্তারের ছেলে। তিনি ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তৃতীয় গ্রেপ্তার ব্যক্তি মো. কামরুল হাসান (১৬)। তিনি কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া, কালিবাজার এলাকার আব্দুল কুদ্দুস ও কুলসুম আক্তারের ছেলে। অন্যজন সিয়ামের বয়স ১৯ বছর। তিনি সদর দক্ষিণ উপজেলার এলাহীপুর এলাকার সেলিম মিয়া ও শিরিনা আক্তারের ছেলে। তিনি কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার দৌলতপুর এলাকার আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। এরা সবাই বখাটে।

 

অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলে যায়। অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলে জানান পুলিশ সুপার।

 

তিনি আরও বলেন, তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ ঘটনায় ফাহাদ ও তার এক বন্ধু জড়িত থাকার বিষয়টি জানা যায়। পরে অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকে হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।

 

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার দিন শুক্রবার বিকেল আনুমানিক ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

 

পুলিশ জানায়, অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার ব্যবহৃত আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। 


 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]