নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় ঘরোয়া আয়োজনের স্বাভাবিক খাবার ছিল পোলাও। এখন সেই পোলাওর চাল কিনতেই কেজিতে গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। দাম বাড়ার এই ধাক্কায় শুধু পরিবার নয়, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। কিন্তু এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেন, এক বছরের ব্যবধানে পোলাওর চালের দ্বিগুণ রপ্তানির অনুমোদন নাকি কৃত্রিম সংকট?
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পর থেকেই বাজারে সরবরাহ কমে দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের আরেক অংশের অভিযোগ, বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধান-চাল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। আবার রপ্তানিকারকদের দাবি, উত্পাদন ও চাহিদার তুলনায় দেশে সুগন্ধি চালের পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত রয়েছে। তাই অল্প পরিমাণ রপ্তানির কারণে এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি এবং খোলা চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও কোনো কোনো প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা ও খোলা পোলাওর চাল ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাইকারি বাজারেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এক মাস আগে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তা ৭ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৯ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাত্ এক মাসেই বেড়েছে ২ হাজার টাকা।
কেন বাড়ছে দাম?
পোলাওর চাল মূলত ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান থেকে উত্পাদিত হয়। দিনাজপুরে এই ধানের বড় অংশ উত্পাদিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দিনাজপুরে মোট ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর। এর মধ্যে চিনিগুঁড়া চাষ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর, গত বছর যা ছিল ৯৪ হাজার হেক্টর। তবে বাজারে চালের দাম বাড়ার ব্যাখ্যায় একাধিক কারণ সামনে এসেছে। একদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানির অনুমোদন পাওয়ার পর দেশীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। অন্যদিকে বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। পরে ধানের দাম বাড়ার কথা বলে তারা চালের দাম বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে আবার বলা হচ্ছে, বাজারের সংকটের জন্য রপ্তানিকে দায়ী করা ঠিক নয়। বাংলাদেশ রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসাইন জানিয়েছেন, গত এক মাসে প্রায় ২ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছে। তাদের হিসাবে দেশে বছরে অন্তত ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উত্পাদিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। অর্থাত্ উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৬ লাখ টন। তাদের যুক্তি, উদ্বৃত্তের সামান্য অংশ রপ্তানি হলে দেশের বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়।
রপ্তানির অনুমোদন কি দায়ী?
চলতি অর্থবছরে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে; যা গত অর্থবছরে ছিল ২৩ হাজার ৯৫৯ টন। অর্থাত্, বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণে পোলাওর চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, রপ্তানির অনুমোদনের পর দেশীয় বাজারে চালের দাম দ্রুত বেড়েছে। রাজধানীর তুরাগ এলাকার নতুন বাজারের সাদ্দাম জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম হোসেন বলেন, এবার প্রচুর পরিমাণে পোলাওর চাল রপ্তানি করা হচ্ছে। তাই দাম অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, পোলাওর চালের দাম বাড়ায় ভালো মানের নাজির ও কাটারিভোগ চালের দামও বেড়েছে বলে তিনি জানান।
নাকি কৃত্রিম সংকট?
এদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মিলগুলো উত্পাদন মৌসুমেই বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেছে। পরে সেই ধানের দাম বৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়ে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। সাবেক সচিব ও বর্তমানে ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমারস্ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেছেন, দেশে বছরে ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উত্পাদিত হয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর কয়েক লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকে। তাই রপ্তানির কারণে বাজারে এমন সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। এছাড়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও জ্বালানিসংকটের যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে, সেটিও অযৌক্তিক। যদি জ্বালানি ও পরিবহনের জন্য দাম বাড়ত, তাহলে অন্যান্য চালেরও দাম বাড়ার কথা।