নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রায়ত্ত তিন গণমাধ্যমের সংকট কাটাতে প্রয়োজন গণমুখী নীতি, তৃণমূলে সাংবাদিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা। একটি গণমাধ্যমের শক্তি তার লোগোতে নয়, মানুষের আস্থায়। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনগণের কথা তুলে ধরার সক্ষমতাই একটি গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও
বাংলাদেশ বেতারকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিটিভির লোগো পরিবর্তন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, শুধু লোগো বদলালেই কি বদলাবে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সম্প্রচার মাধ্যমের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা? নাকি প্রয়োজন এর কাঠামো, সংবাদ পরিবেশনের ধরন এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রমের আমূল পরিবর্তন? বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের মতে, বিটিভির লোগো পরিবর্তনের চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্বশীল ও গণমুখী গণমাধ্যমে পরিণত করা। তার ভাষায়, বিটিভির গ্রহণযোগ্যতা ও ☕দর্শকসংখ্যা তলানিতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হতে পারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বসবাস রাজধানীর বাইরে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ এসব এলাকার মানুষের জীবন, সংকট, সম্ভাবনা ও উন্নয়নচিত্রই বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম যদি জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদ কাভারেজও হওয়া উচিত জনগণকেন্দ্রিক। উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি থাকলে স্থানীয় সমস্যা, প্রশাসনের কার্যক্রম, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি, নদীভাঙন, দুর্যোগ, অপরাধ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনার খবর সরাসরি জাতীয় সম্প্রচারে উঠে আসতে পারে। এতে শুধু বিটিভির সংবাদভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে না; বরং তৃণমূলের মানুষও রাষ্ট্রায়ত্ত
গণমাধ্যমকে নিজেদের গণমাধ্যম হিসেবে ভাবার সুযোগ পাবে। জনগনের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রের এ গণমাধ্যমগুলোর আর্থিক অবস্থাও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মে মাসের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিটিভির আয় ছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আগের কয়েক বছরের হিসাবেও একই ধরনের বড় ব্যবধান দেখা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, আর ব্যয় বেড়ে হয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ৪৪ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার টাকা হলেও ব্যয় হয়েছে ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা। সংখ্যাগুলো শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে আনে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসসের চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশে মিডিয়াভুক্ত ৫৮৪টি পত্রিকা ও ৩৬টি টেলিভিশন চ্যানেল থাকার পরও বাসসের গ্রাহকসংখ্যা ৫০-এর নিচে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির গ্রাহক ৪৮টি; এর মধ্যে নিয়মিত সেবা নেয় ২৮টি মিডিয়া। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাসসের অবস্থান শক্তিশালী নয়। ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ সংস্থার সঙ্গে খবর আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও বিদেশে বাসসের নিজস্ব গ্রাহক নেই। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির গ্রাহক বাসস। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাসসকে অন্য সংস্থার সেবা নিতে হচ্ছে, অথচ নিজের উৎপাদিত সংবাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সক্ষমতা তৈরি হয়নি—এটি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাসসের বিজ্ঞাপন আয়ও নেই। বার্ষিক গ্রাহক ফি থেকে আয় প্রায় ৬৭ লাখ টাকা হলেও সেই অর্থও অনাদায়ী থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে সরকার থেকে বছরে ৩৮ কোটি টাকার বেশি অনুদান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা যদি বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদসেবা কতটা জনগণ ও দেশের গণমাধ্যমের কাজে লাগছে? বাসসকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ হলো—দলীয়করণ, ইচ্ছেমতো নিয়োগ ও পদোন্নতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনের তুলনায় ভারী হয়ে পড়েছে।
ফলে সরকারি অর্থের বড় অংশ বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্মীদের চাকরি ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জনস্বার্থে তার অবদান। তাই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও সেবামুখী হতে পারে—সেটিই হওয়া উচিত মূল আলোচনার বিষয়। বিটিভি ও বাসসের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় দেশের কোটি মানুষের কাছে সংবাদ, বিনোদন ও জনসচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বেতার। ডিজিটাল যুগে এসে মানুষের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর সামনে প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি। এই বাস্তবতায় শুধু পুরোনো কাঠামো ধরে রাখলে হবে না। বেতারকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় কনটেন্ট, দ্রুত সংবাদ এবং জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির ১৪ দফা দাবির মধ্যেও এটি অন্যতম। দাবিটি বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিকের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের পরিধিও বহুগুণে বাড়তে পারে।একজন স্থানীয় প্রতিনিধি তার এলাকার এমন অনেক খবর জানেন, যা ঢাকার কোনো ডেস্কের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, নৈতিকতার মানদণ্ড এবং পেশাগত জবাবদিহির আওতায় এই প্রতিনিধিদের কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে। একটি গণমাধ্যমের ব্র্যান্ডিং
গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্র্যান্ডের বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিটিভির পর্দায় নতুন লোগো দর্শকের চোখে পড়বে; কিন্তু দর্শককে ধরে রাখবে ভালো অনুষ্ঠান, নির্ভরযোগ্য সংবাদ, দ্রুত আপডেট, স্থানীয় মানুষের কথা এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সাংবাদিকতা। একইভাবে বাসসের নতুন ভবন, নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন স্লোগান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সংবাদ দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ বেতারও তখনই তার পুরোনো শক্তি ফিরে পাবে, যখন শ্রোতা মনে করবেন—এই মাধ্যমটি তার জীবনের কথা বলে। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে বাঁচাতে হলে শুধু সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার নেতৃত্ব, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংবাদ পরিবেশনের সংস্কৃতি এবং কঠোর জবাবদিহি। এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যারা চাকরিকে শুধু বেতন-ভাতার সুযোগ হিসেবে দেখবেন না; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবেন। যারা মাঠে যাবেন, মানুষের কথা শুনবেন, তথ্য যাচাই করবেন এবং রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত গণমাধ্যমকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখবেন। বেসরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে সরকারি প্রতিষ্ঠানসুলভ ধীরগতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে হবে। বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার—এই তিন প্রতিষ্ঠান কেবল সরকারি দপ্তর নয়; এগুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত জাতীয় গণমাধ্যম। তাই এগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে জনগণের অর্থ, তথ্যের অধিকার এবং গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। লোগো পরিবর্তন একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন। প্রয়োজন তৃণমূলে প্রতিনিধি, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে যদি সত্যিকার অর্থে গণমুখী করা যায়, তাহলে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল তিনটি প্রতিষ্ঠানও একদিন বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য প্রতিযোগিতার শক্তিশালী
চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। দেখার অপেক্ষায় নতুন সরকারের নতুন দায়িত্বশীলরা কী পারবেন খাদের কিনারা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে রাষ্টায়াত্ত এ তিনটি গণমাধ্যমকে গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিনত করতে? লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।01712306501/[email protected]
রাষ্ট্রায়ত্ত তিন গণমাধ্যমের সংকট কাটাতে প্রয়োজন গণমুখী নীতি, তৃণমূলে সাংবাদিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা। একটি গণমাধ্যমের শক্তি তার লোগোতে নয়, মানুষের আস্থায়। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনগণের কথা তুলে ধরার সক্ষমতাই একটি গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও
বাংলাদেশ বেতারকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিটিভির লোগো পরিবর্তন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, শুধু লোগো বদলালেই কি বদলাবে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সম্প্রচার মাধ্যমের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা? নাকি প্রয়োজন এর কাঠামো, সংবাদ পরিবেশনের ধরন এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রমের আমূল পরিবর্তন? বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের মতে, বিটিভির লোগো পরিবর্তনের চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্বশীল ও গণমুখী গণমাধ্যমে পরিণত করা। তার ভাষায়, বিটিভির গ্রহণযোগ্যতা ও ☕দর্শকসংখ্যা তলানিতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হতে পারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বসবাস রাজধানীর বাইরে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ এসব এলাকার মানুষের জীবন, সংকট, সম্ভাবনা ও উন্নয়নচিত্রই বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম যদি জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদ কাভারেজও হওয়া উচিত জনগণকেন্দ্রিক। উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি থাকলে স্থানীয় সমস্যা, প্রশাসনের কার্যক্রম, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি, নদীভাঙন, দুর্যোগ, অপরাধ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনার খবর সরাসরি জাতীয় সম্প্রচারে উঠে আসতে পারে। এতে শুধু বিটিভির সংবাদভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে না; বরং তৃণমূলের মানুষও রাষ্ট্রায়ত্ত
গণমাধ্যমকে নিজেদের গণমাধ্যম হিসেবে ভাবার সুযোগ পাবে। জনগনের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রের এ গণমাধ্যমগুলোর আর্থিক অবস্থাও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মে মাসের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিটিভির আয় ছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আগের কয়েক বছরের হিসাবেও একই ধরনের বড় ব্যবধান দেখা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, আর ব্যয় বেড়ে হয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ৪৪ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার টাকা হলেও ব্যয় হয়েছে ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা। সংখ্যাগুলো শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে আনে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসসের চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশে মিডিয়াভুক্ত ৫৮৪টি পত্রিকা ও ৩৬টি টেলিভিশন চ্যানেল থাকার পরও বাসসের গ্রাহকসংখ্যা ৫০-এর নিচে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির গ্রাহক ৪৮টি; এর মধ্যে নিয়মিত সেবা নেয় ২৮টি মিডিয়া। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাসসের অবস্থান শক্তিশালী নয়। ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ সংস্থার সঙ্গে খবর আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও বিদেশে বাসসের নিজস্ব গ্রাহক নেই। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির গ্রাহক বাসস। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাসসকে অন্য সংস্থার সেবা নিতে হচ্ছে, অথচ নিজের উৎপাদিত সংবাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সক্ষমতা তৈরি হয়নি—এটি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাসসের বিজ্ঞাপন আয়ও নেই। বার্ষিক গ্রাহক ফি থেকে আয় প্রায় ৬৭ লাখ টাকা হলেও সেই অর্থও অনাদায়ী থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে সরকার থেকে বছরে ৩৮ কোটি টাকার বেশি অনুদান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা যদি বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদসেবা কতটা জনগণ ও দেশের গণমাধ্যমের কাজে লাগছে? বাসসকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ হলো—দলীয়করণ, ইচ্ছেমতো নিয়োগ ও পদোন্নতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনের তুলনায় ভারী হয়ে পড়েছে।
ফলে সরকারি অর্থের বড় অংশ বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্মীদের চাকরি ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জনস্বার্থে তার অবদান। তাই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও সেবামুখী হতে পারে—সেটিই হওয়া উচিত মূল আলোচনার বিষয়। বিটিভি ও বাসসের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় দেশের কোটি মানুষের কাছে সংবাদ, বিনোদন ও জনসচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বেতার। ডিজিটাল যুগে এসে মানুষের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর সামনে প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি। এই বাস্তবতায় শুধু পুরোনো কাঠামো ধরে রাখলে হবে না। বেতারকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় কনটেন্ট, দ্রুত সংবাদ এবং জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির ১৪ দফা দাবির মধ্যেও এটি অন্যতম। দাবিটি বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিকের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের পরিধিও বহুগুণে বাড়তে পারে।একজন স্থানীয় প্রতিনিধি তার এলাকার এমন অনেক খবর জানেন, যা ঢাকার কোনো ডেস্কের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, নৈতিকতার মানদণ্ড এবং পেশাগত জবাবদিহির আওতায় এই প্রতিনিধিদের কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে। একটি গণমাধ্যমের ব্র্যান্ডিং
গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্র্যান্ডের বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিটিভির পর্দায় নতুন লোগো দর্শকের চোখে পড়বে; কিন্তু দর্শককে ধরে রাখবে ভালো অনুষ্ঠান, নির্ভরযোগ্য সংবাদ, দ্রুত আপডেট, স্থানীয় মানুষের কথা এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সাংবাদিকতা। একইভাবে বাসসের নতুন ভবন, নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন স্লোগান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সংবাদ দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ বেতারও তখনই তার পুরোনো শক্তি ফিরে পাবে, যখন শ্রোতা মনে করবেন—এই মাধ্যমটি তার জীবনের কথা বলে। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে বাঁচাতে হলে শুধু সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার নেতৃত্ব, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংবাদ পরিবেশনের সংস্কৃতি এবং কঠোর জবাবদিহি। এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যারা চাকরিকে শুধু বেতন-ভাতার সুযোগ হিসেবে দেখবেন না; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবেন। যারা মাঠে যাবেন, মানুষের কথা শুনবেন, তথ্য যাচাই করবেন এবং রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত গণমাধ্যমকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখবেন। বেসরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে সরকারি প্রতিষ্ঠানসুলভ ধীরগতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে হবে। বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার—এই তিন প্রতিষ্ঠান কেবল সরকারি দপ্তর নয়; এগুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত জাতীয় গণমাধ্যম। তাই এগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে জনগণের অর্থ, তথ্যের অধিকার এবং গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। লোগো পরিবর্তন একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন। প্রয়োজন তৃণমূলে প্রতিনিধি, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে যদি সত্যিকার অর্থে গণমুখী করা যায়, তাহলে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল তিনটি প্রতিষ্ঠানও একদিন বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য প্রতিযোগিতার শক্তিশালী
চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। দেখার অপেক্ষায় নতুন সরকারের নতুন দায়িত্বশীলরা কী পারবেন খাদের কিনারা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে রাষ্টায়াত্ত এ তিনটি গণমাধ্যমকে গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিনত করতে? লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।01712306501/[email protected]