কাঁচি নয় ব্লেডই ভরসা আবেদ তেলির; ৩৫ বছর ধরে বিনামূল্যে চুল কাটেন অ'সচ্ছল মানুষের

আপলোড সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৯:৩৭:১৫ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৯:৩৯:৩০ পূর্বাহ্ন
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-



কাঁচি, চিরুনি বা কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই মানুষের চুল কেটে দিচ্ছেন মোঃ আবেদ তেলি। ডান হাতে একটি ব্লেড আর বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করে দারুণ দক্ষতায় এই কাজ করেন তিনি। বিনিময়ে নেন না কোনো টাকা। এভাবেই প্রায় ৩৫ বছর ধরে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের অসচ্ছল মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।



তার এই ব্যতিক্রমী পদ্ধতিতে চুল কাটার দৃশ্য দেখতে ভিড়ও করেন অনেকে। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের মোঃ আবেদ তেলি অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। জীবিকা নির্বাহের জন্য রয়েছে ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফলমূলের গাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন তিনি। এসব কাজের আয়েই চলে তার সংসার। তবে নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সময় দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মোঃ আবেদ তেলির চুল কাটার পদ্ধতিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কাঁচি, খুর কিংবা চিরুনি ছাড়াই শুধু একটি ব্লেড দিয়ে তিনি চুল কাটেন। ডান হাতে ব্লেড দিয়ে চুল কাটার সময় বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই কাজটিতে তিনি দক্ষ হয়ে উঠেছেন। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের চুল কাটেন বলে জানান আবেদ তেলি। বিশেষ করে অর্থের অভাবে যারা নিয়মিত চুল কাটাতে পারেন না, তাদের অনেকেই তার কাছে আসেন। কেউ নিজের পছন্দের ধরন বলে দিলে সেভাবেই চুল কেটে দেন তিনি। মোঃ


আবেদ তেলি বলেন, ‘ছেলে-পেলে আসে, আমাকে বলে ভালো করে কেটে দেন। যে যেভাবে চায়, আমি সেভাবেই তাকে দিয়ে দেই। অনেক খুশি হয়ে যায়। তার এই কাজের শুরু প্রায় ৩৫ বছর আগে।’ সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মোঃ আবেদ তেলি বলেন, ‘এক ছেলে স্কুলে গেইছে। তার মাস্টার চুল ধরি টান দিয়েছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলি আসছে। বললাম, বাবা কাঁদিস কেন? সে বলল, আমার চুল ধরি টানছে। বললাম, চুল কাটি নিতে পারো না? বললো, আমার পয়সা নাই, আমার আব্বারও পয়সা নাই। সেদিন একটি ব্লেড নিয়ে আসি, চুল কাটা আরম্ভ করি। সেদিন থেকেই আমার চুল কাটা শুরু।’ এরপর থেকে আর থামেননি তিনি। গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে সময়মতো চুল কাটাতে পারেন না। তাদের কাছে আবেদ তেলি হয়ে উঠেছেন ভরসার মানুষ। শুধু চুল কাটাই নয়, মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও সচেতন করেন তিনি। কারও মাথায় বড় ও অপরিচ্ছন্ন চুল দেখলে নিজ থেকেই চুল কাটার পরামর্শ দেন। সময়মতো নখ কাটা ও পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও কথা বলেন। কেন কোনো পারিশ্রমিক না নিয়ে এত সময় ব্যয় করে এই কাজ করেন জানতে চাইলে আবেদ


তেলি বলেন, ‘অপরিষ্কার লোক দেখতে ভালো লাগে না। অপরিষ্কার চুল ঝাকড়া-পাকড়া কেমন দেখা যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার ভালো লাগে।’ মোঃ আবেদ তেলির কাছে নিয়মিত চুল কাটান মোঃ আহছান হাবীব হাসান। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই টাকা ছাড়াই আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই।’ আরেক চুল কাটানো ব্যক্তি মোঃ শাহ আলম সরকার বলেন, ‘টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে এটাই আমার শেষ ভরসা।’ স্থানীয় বাসিন্দা আইনজীবী মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘অভাবের মধ্যেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা প্রশংসনীয়।’ কুড়িগ্রাম জেলার সহকারী সমাজসেবা অফিসার মোছাঃ ববিতা খাতুন বলেন, ‘নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবেদ তেলির মতো মানুষের উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে পারে।’ প্রায় পাঁচ দশক ধরে একটি ব্লেড হাতে নিয়ে মানুষের চুল কেটে যাচ্ছেন আবেদ তেলি।



নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও ভালো লাগার কথা ভেবে বিনা পারিশ্রমিকে সময় দেন তিনি। রাজারহাটের নিভৃত গ্রামের এই মানুষটির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আজও অর্থের অভাবে চুল কাটাতে না পারা মানুষের জন্য হয়ে আছে এক নির্ভরতার জায়গা।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]