নিজস্ব প্রতিবেদক
চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ছাত্রদের আন্দোলন একপর্যায়ে রূপ নিয়েছিল গণআন্দোলনে। সে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণরা। যার ফসল হিসেবে পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর নির্বাচনে বিএনপির প্রতিশ্রুতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল সে তরুণ প্রজন্ম। দলটির ইশতেহারে কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সরকারের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেয়ে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা মানুষের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি দূরের কথা, বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগের খরা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের নজিরবিহীন নিম্নগতি, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট, উৎপাদন কমে যাওয়া, কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই—সব মিলিয়ে কর্মসংস্থানের বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া ও ওমানের শ্রমবাজার পুরোপুরি খুলতে পারেনি সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজারেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সরকারের স্বপ্নের ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি রূপরেখা।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ না বাড়লে সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অথচ জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদ, ডলার সংকট, দুর্নীতি, করের চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার মতো বিনিয়োগের প্রধান বাধাগুলো এখনো কাটেনি। ফলে একদিকে লাখো তরুণ চাকরির অপেক্ষায় দিন গুনছেন, অন্যদিকে কর্মরতদের চাকরি ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কর্মসংস্থানের সংকট আরো গভীর হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার পাঁচ বছরমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছে। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুসারে, পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে এক লাখ, মিরসরাইয়ে জাপানি বিভিন্ন কোম্পানি ও অন্যান্য বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে ১০-১৫ লাখ, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ এবং বন্ধ থাকা পাটকল চালুর মাধ্যমে ১১ হাজার ৬২৯ জনকে চাকরি প্রদান। তবে বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে এগুলোর সবই আলোচনা ও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বর্তমান সরকারের ছয় মাসে সরকারিভাবে মোট কতটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, এর নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি কোনো মন্ত্রণালয় থেকে। ফলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে কত শতাংশ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে, এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তরও নেই।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি ও নিট পোশাকশিল্পের দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাইয়ের শিকার হন। অন্যদিকে শিল্পপুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়। এসব কারখানা বন্ধের পেছনে জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের ৯ শতাধিক টেক্সটাইল মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বস্ত্র খাতের সংগঠন বিটিএমএ।
বেসরকারি খাতে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশের বিনিয়োগের চিত্র তিনটি সূচক থেকে পাওয়া যায়। প্রথমত, বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন বাড়বে। বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণ বাড়বে। একইভাবে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত জুন শেষে এ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে। আগের মাসে যা ছিল ৪.৯৮ শতাংশ। এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে সংরক্ষিত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির ইতিহাসে এত কম প্রবৃদ্ধি আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি অতীতের বড় আর্থিক সংকটগুলোর সময়ও নয়।
যা বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূরীকরণের প্রচেষ্টাগুলো অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একদিকে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে ৯ শতাধিক টেক্সটাইল মিলসহ চার শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ২০ হাজার শ্রমিকের কাজ হারানো শিল্প খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশে ২৬ লাখ ২০ হাজার বেকারের এ মিছিলে আট লাখ ৮৫ হাজারই উচ্চশিক্ষিত স্নাতক।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ১৭ শতাংশ স্নাতক সম্পন্নকারী শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের দুই বছর পরও বেকার থাকছেন। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারে প্রকৃত চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে এবং বর্তমানে প্রতি তিনজন বেকারের একজন উচ্চশিক্ষিত।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ আমার দেশকে বলেন, বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না। বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ধ কলকারখানা খুলতে হবে। জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের বিদ্যমান নীতি-কাঠামো বজায় থাকলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। এটি একেবারে পরিষ্কার বিষয়।
তিনি আরো বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকারকে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বিনিয়োগ বাড়লে রাজস্ব আয়ও বাড়বে। নতুন করে কর্মসংস্থান হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে কী বলছেন মন্ত্রী
দেশে বিনিয়োগ ও হতাশার মধ্যে বিদেশে কর্মসংস্থান বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এমপি আমার দেশকে বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুসারে জনশক্তি রপ্তানির ম্যাপিং করা হচ্ছে। যদিও যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে, তবে জাপানে বেড়েছে। অন্যদিকে ইউরোপে বৈধভাবে জনশক্তি রপ্তানির জন্য আলোচনা চলছে। মালয়েশিয়ায় সংকুচিত বাজার আশা করি এ মাসেই খুলছে। আমাদের মোট জনশক্তি রপ্তানির ৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে হয়। প্রধানমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্যের সফরের পর আশা করি সেখানে জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন দূতাবাসে প্রবাসীদের হয়রানি কমানো ও সেবার মান বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আলোচনায় সীমাবদ্ধ ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর স্বপ্ন দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশব্যাপী ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারে সচ্ছলতা ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এটি করার কথা। কিন্তু সেটি আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ গঠনসংক্রান্ত কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে চারটি বৈঠক করেছে। বৈঠকে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়েছে। তবে এখনো রূপরেখা চূড়ান্ত হয়নি।
খোলেনি নতুন শ্রমবাজার
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বাজার এখনো বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। হাতেগোনা কয়েকটি দেশে বেশিরভাগ অদক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। নতুন বিকল্প বাজার গড়ে না ওঠায় প্রবাসীদের কয়েকটি প্রধান গন্তব্যও বন্ধ রয়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ছয় মাসে তিন লাখ ১৮ হাজার ৩৫০ কর্মী বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৪০টি দেশের নাম থাকলেও ১০-১২টি দেশেই কর্মী যাচ্ছেন।
এসব বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব আব্দুর রহমান তরফদার আমার দেশকে বলেন, ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান। ইতিমধ্যে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। আপাতত ছোট আকারে চালু করা হবে। ইতিমধ্যে থিংক ট্যাংক ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। শিগগির ধারণাপত্র তৈরি করা হবে। মূলত চাকরিদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে ব্রিজিং করা হবে। দেশের বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে রেফারেল হিসেবে আমাদের মন্ত্রণালয় কাজ করবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলার। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতি এক ট্রিলিয়ন ডলার বা এক হাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও এ লক্ষ্য সামনে এনে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতি বছর গড়ে ৯ শতাংশের বেশি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সেটি একেবারে অসম্ভব।
বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা সাড়ে ছয় শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাস্তবায়ন কঠিন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নেও জিডিপির অন্তত ২৫ শতাংশের উপরে বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২-২৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এটি দ্রুত বাড়ানো জরুরি। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়লে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান শুধু পরিকল্পনা আর আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।