নিজস্ব প্রতিবেদক
রোমাঞ্চকর ভ্রমণের তীর্থস্থান মানেই বান্দরবান। আর সেটি হওয়া চাই দুর্গম পাহাড়ের প্রান্তে। যেই ভাবনা, সেই কাজ। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের ভাই-বন্ধুরা ছুটলাম বান্দরবানের রোয়াংছড়ি। যেতে যেতে ফজরের নামাজ পড়লাম কেরানীহাটে। হালকা নাশতা শেষে লাল চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ভোরের বাতাসের আলিঙ্গনে আবার ছুটে চলি। ছুটতে ছুটতে বান্দরবান সদর সুয়ালক চেকপোস্টে গাড়ি থামে। একেক জনের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই-বাছাই চলাকালীন কাশ্মীরি বশিরকে সত্যি সত্যিই ভিনদেশি ভেবে তার সঙ্গে বেশ মজার একটা ঘটনা ঘটে যায়, যা আমৃত্যু মনে পড়লে এবারের ভ্রমণসঙ্গীরা একাকীই হেসে উঠবে। মাইক্রো চেকপোস্ট ছাড়ে। তবু কারো হাসি থামে না। ভ্রমণে এসব ছোট ঘটনাগুলো পরবর্তী যেকোনো আড্ডায় হয়ে ওঠে বিনোদনের খোরাক।
গাড়ি শহর ছাড়িয়ে রোয়াংছড়ির পাহাড়ি সড়কে। পথের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্পে। তারাছা নদীর তীরবর্তী কাঠ-বাঁশের তৈরি দোতলা এক চিৎকাইৎ বোর্ডিংয়ে উঠি। বারান্দা থেকে বাইরের অপরূপ দৃশ্যে চোখ আটকায়। সাঙ্গুর শাখা নদী তারাছার সৌন্দর্যও কম যায় না। প্রায় ৯টার সময় নির্ধারিত রুটগাইড এলে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি মূল গন্তব্য মূরনখলের পথে। শুরুতেই মাহেন্দ্রে চড়ে তুলা পাড়ার মুড়া গিয়ে নামি। এরপর কাজুবাদামের বাগানের ভেতর দিয়ে হাইকিং করে ম্রক্ষং ঝিরিতে শুরু হয় ট্রেইল। প্রথমদিকে অন্যান্য ট্রেইলের মতো হলেও ধীরে ধীরে আবিষ্কার করি এর ভিন্ন এক জাদুকরী মায়া। যেন পুরো পরিবেশটাই এক মায়াময় জাদু আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেই জাদুর মোহে আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গভীর থেকে গভীরে।
যেতে যেতে থালার মতো গোলাকার একটি ভুতুড়ে জায়গায় এসে থামি। পাশেই ছোট্ট একটি ঝরনা। রিমঝিম শব্দ তুলে অবিরাম ধারায় পানি বয়ে চলছে। ঝরনাটা ছোট্ট হলেও অসাধারণ। কিন্তু ঝরনার তলদেশে যাওয়ার পথটা মোটেও সহজ নয়। গাছের শিকড় ধরে নামার সময় পুরোপুরি উপুড় হয়ে প্রায় চার-পাঁচ ফুট নিচে পড়ে যাই। তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি সামলে নিই। তবে আরেকটু হলে আনুমানিক বিশ ফুট নিচে পাথরের ওপর পড়ে জীবনলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতে পারত। আকস্মিক ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় সবাই আরো বেশি সতর্ক হই। খাড়া পিচ্ছিল পথে নিচে নেমে ঝরনার ধারে পাথরের বোল্ডারে বসি। চারদিক সুনসান নীরব। এ রকম পরিবেশে ঝরনার গান শুনতে বেশ লাগে। রিমঝিম ছন্দ তোলেÑকোথা হতে এলো এত পানি, আবার কোথায় বয়ে যায় কলকল শব্দ করে।
কিছুক্ষণ জিরিয়ে আবার চলতে শুরু করি। ছোট-বড় পাথুরে পথ মাড়িয়ে খানিকটা সময় পেরোতেই চোখ আটকায় দুই পাহাড়ের সরু গলিতে। যেখানটায় পথের শেষ ভেবেছিলাম, এখন দেখছি মূরনখলের মূল সৌন্দর্যের ঝাঁপি যেন সেখানটাতেই শুরু। এর জন্যই পাহাড়ের প্রেমে যে একবার মজে, তাকে ফেরানোর সাধ্য নেই কারো। এখন কী দেখছি, সামনে কী দেখব—তা আগেভাগে বোঝা বড় মুশকিল। আর সেটি যদি হয় নিষিদ্ধ ট্রেইল, তাহলে তো আর কথাই নেই। শুরুতেই গাইডকে দিয়ে রেকি করালাম। এরপর পাহাড়ের চিপায় কোমরসমান ঘোলা পানিতে নেমে যায় অদম্য, দুর্বার, ভ্রমণপাগলাটে ‘দে-ছুট’-এর দামাল দল। পানির নিচে ছোট-বড় পাথর। পাহাড়ের প্রাচীরঘেরা ঘন লতাগুল্ম। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। যতই এগোতে থাকি, ততই শিহরিত হই। যেতে যেতে কোথাও বুক পানি, কোথাওবা দিতে হচ্ছে সাঁতার।
দুপাশে দিগন্তছোঁয়া খাড়া পাহাড়। তার ওপর ঘন জঙ্গল। মাঝে সরু পথ। সেই পথ কখনো কখনো এতটাই ক্ষীণ, সূর্যের আলোও সেখানে ভয়ে পালিয়েছে! কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। শেষের দিকে কিছু কিছু পথ এতটাই সরু, একজনের বেশি এগোনো ছিল বড় কঠিন। এমন কঠিন কঠিন চিপাচাপা পথেই প্রায় ঘণ্টাখানেক ট্রেইল শেষে খামারপাড়া দিয়ে বের হই। এ কারণেই বান্দরবানকে ভ্রমণের তালিকায় শীর্ষে রাখি। অ্যাডভেঞ্চার না থাকলে ভ্রমণ পানসে লাগে।
যোগাযোগ : ঢাকা-বান্দরবান। বান্দরবান থেকে রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্প।
থাকা-খাওয়া : কচ্ছপতলীতে সাধারণ মানের বোর্ডিং ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে।
সতর্কতা : জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও শুকনো খাবার সঙ্গে রাখবেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে প্রহসন ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ থেকে বিরত থাকবেন। বিশেষ করে নারীদের দিকে দৃষ্টি সংযত রেখে চলুন।