কলেরার টিকা কেন এখন, কারা পাবেন এই টিকা?

আপলোড সময় : ২২-০৮-২০২৬ ১০:২৩:৪৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-০৮-২০২৬ ১০:২৩:৪৮ পূর্বাহ্ন


নিজস্ব প্রতিবেদক

কলেরা প্রতিরোধে দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে বাংলাদেশ সরকার। আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় শনিবার, ২২ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে এই কর্মসূচির প্রথম ধাপ। ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানার প্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে দুই ডোজ করে মুখে খাওয়ার কলেরার টিকা দেওয়া হবে। 

 

প্রথম ডোজ দেওয়া হবে ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে।

 

হঠাৎ করে কেন এই উদ্যোগ?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, কলেরার প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়ামূলকভাবে নয়, বরং রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধের লক্ষ্যেই এই টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, এটি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। কয়েক বছর ধরে চলা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০২৪ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কলেরার টিকা দেওয়ার কথা ছিল আন্তর্জাতিক টিকা জোট গ্যাভির। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, টিকার চাহিদা ও উৎপাদনসংক্রান্ত নানা কারণে কর্মসূচিটি নির্ধারিত সময়ে শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০২৫ সালে এটি অনুমোদন পায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গ্যাভি এসব টিকা অনুদান হিসেবে দেওয়ায় টিকা কেনার জন্য সরকারের আলাদা অর্থ বরাদ্দ করতে হচ্ছে না।

 

 

কোন কোন এলাকায় টিকা দেওয়া হচ্ছে?

প্রথম ধাপে দেশের ১৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানাকে টিকাদানের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচরের ১৭টি ওয়ার্ডে ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও; মুন্সিগঞ্জ সদর; কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল; নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর উপজেলায়ও কর্মসূচি চলবে। 

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মোট ১৪৪টি উপজেলা ও থানায় কলেরার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

কীভাবে নির্ধারণ করা হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা?

টিকাদানের এলাকা অনুমানের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কলেরার প্রকোপ, জনসংখ্যার ঘনত্ব, জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিপ্রবণতা, আগের টিকাদানের ইতিহাস এবং সংক্রমণের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্লোবাল টাস্কফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোলের সঙ্গে গ্যাভির তৈরি একটি বিশ্লেষণী টুল ব্যবহার করে ‘প্রায়োরিটি এরিয়াস ফর মাল্টিসেক্টোরাল ইন্টারভেনশন’ বা PAMIs বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহামেদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কলেরা প্রতিরোধের জন্য মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ ডোজ টিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আগে সুরক্ষা দেওয়াই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

 

কারা এই টিকা পাবেন?

কলেরার টিকা এক বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের বিনামূল্যে দেওয়া হবে। তবে গর্ভবতী নারীরা এই কর্মসূচির আওতায় থাকছেন না। টিকাটি মুখে খেতে হয় এবং কলেরা থেকে সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, কেউ যদি শুধু একটি ডোজ নেন, তাহলে পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যাবে না এবং টিকার সুরক্ষা পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী নাও হতে পারে।

 

কতদিন সুরক্ষা দেবে?

দুই ডোজ সম্পূর্ণ করার পর টিকাটি প্রায় তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে টিকা নেওয়ার পরও নিরাপদ পানি পান, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। কারণ শুধু টিকা দিয়ে কলেরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

 

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্যান্য টিকার মতো কলেরার টিকা গ্রহণের পরও সাময়িক কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে বমি ভাব বা কখনও কখনও ডায়রিয়া হতে পারে। তবে এটিকে তুলনামূলকভাবে কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত টিকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ২০২২ সালের কলেরার প্রাদুর্ভাবের সময় এবং এর আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একই ধরনের টিকা ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 

 

কলেরার রোগীর তুলনায় এত মানুষকে টিকা দেওয়া কেন?

এ নিয়েও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আইসিডিডিআর,বি ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিভুক্ত কলেরার রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১৪১ জন। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। পরে কমলেও ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আবারও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। তবে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে না আসা অনেক রোগী হিসাবের বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নথিভুক্ত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং ওরস্যালাইনের ব্যবহারের কারণে কলেরার পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাই টিকাদানের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত সুফল পাওয়া যাবে, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, টিকা দেওয়ার পর এর ফলাফল বিশ্লেষণ করেই বোঝা যাবে কর্মসূচিটি কতটা কার্যকর হয়েছে।

 

শুধু টিকা নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও জরুরি

কলেরা নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকাদানের ওপর নির্ভর করছে না সরকার। দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, স্যানিটেশন উন্নত করা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৈশ্বিক রোডম্যাপের ভিত্তিতে বাংলাদেশে জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা (NCCP) তৈরি করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে এবারের টিকাদান কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো—কলেরা হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার বদলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আগেই সুরক্ষা দেওয়া।

তবে দীর্ঘমেয়াদে কলেরা নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]