রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো:
জীর্নশীর্ণ একটি ছোট্ট ঘর। অভাব-অনটনের সংসার। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী। সংসারের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সন্তানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা যেন অনেক বড় সাহসের বিষয়। কিন্তু অভাবের কাছে হার মানেনি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের জবেদপুর গ্রামের তাওহীদ ইসলাম। বুকভরা স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে। অবশেষে সেই স্বপ্নের প্রথম সাফল্যও এসেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫. পেয়েছে হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তান তাওহীদ।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তাওহীদের পরিবারে নেমে আসে আনন্দের মুহূর্ত। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও যেন কোথাও একটা চাপা কষ্ট। কারণ, জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও তাওহীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সে কি ভালো একটি কলেজে ভর্তি হয়ে তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে? ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন কি পূরণ হবে তার....
তাওহীদ ইসলাম বানারীপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের জবেদপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মোঃ ফারুক হোসাইন একজন দিনমজুর এবং মা রিমা খানম গৃহিণী। সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (পাইলট)-এর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে।
তবে তাওহীদের আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একজন শিক্ষকের মানবিক উদ্যোগের গল্প। যে গল্পটি জানলে হয়তো বোঝা যাবে, একটি শিশুর জীবনে একজন শিক্ষকের সামান্য সহায়তা কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তাওহীদ তখন পড়াশোনা করত জবেদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে। অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষে সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (পাইলট) বিদ্যালয়ের মাঠে চলছিল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মহড়া। বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ পলাশ দূর থেকে মাঠের এক পাশে অপরিচিত একটি ছেলেকে বসে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে নাম ও পরিচয় জানতে চাইলে তাওহীদ তার সঙ্গে কথা বলে।
কথা বলার একপর্যায়ে তাওহীদ জানায়, সে জবেদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়তে চায় সে। কিন্তু তার বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শাখা চালু না থাকায় বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। তাই সে সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (পাইলট)-এ ভর্তি হতে চায়।
এরপর তাওহীদ পলাশ স্যারকে কাতর কণ্ঠে বলে, “স্যার, আমি পড়াশোনা করে বড় হতে চাই। আপনাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিজ্ঞান গ্রুপ নিয়ে পড়তে চাই। কিন্তু আমার পড়াশোনা করার মতো আর্থিক সচ্ছলতা নেই। আপনি যদি আমাকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে একটু সাহায্য করতেন, তাহলে ভালো হতো।”
অসহায় ছেলেটির কথা শুনে সাড়া দেন শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ পলাশ। মেধাবী এই শিক্ষার্থী যেন শুধুমাত্র অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন তিনি। অনেক প্রচেষ্টার পর বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে তাওহীদকে নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করানো হয়।
সেখান থেকেই শুরু হয় তাওহীদের নতুন লড়াই। অভাব ছিল, প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তার চেয়ে বড় ছিল স্বপ্ন। অক্লান্ত পরিশ্রম আর পড়াশোনার প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়ে সে এগিয়ে যেতে থাকে। নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাতেও ভালো ফলাফল করে নিজের মেধার প্রমাণ দেয়। এরপর এসএসসি পরীক্ষায়ও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে অর্জন করে জিপিএ-৫.।
তাওহীদের এই সাফল্যে আনন্দিত তার শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ পলাশ। তিনি বলেন, তাওহীদ শুধু তার নিজের পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেনি, বিদ্যালয়ের সম্মানও অক্ষুণ্ন রেখেছে। তার ভবিষ্যৎ জীবন সাফল্যে ভরে উঠুক—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি সবার কাছে তাওহীদের জন্য দোয়া কামনা করেছেন।
কিন্তু তাওহীদের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা। এখন তাকে ভালো একটি কলেজে ভর্তি হতে হবে। এরপর উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ। অথচ দিনমজুর বাবার সামান্য আয়ে সংসারের ব্যয় মেটানোর পর ছেলের কলেজে ভর্তি, বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণ, যাতায়াতসহ পড়াশোনার খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি তাওহীদের চোখে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার ছায়া। ছেলের উচ্চ শিক্ষা অর্জনের ব্যয়ভার বহন নিয়ে চিন্তিত তার বাবা-মা।
যে ছেলেটি একদিন একটি বিদ্যালয়ের মাঠের এক পাশে বসে একজন শিক্ষকের কাছে শুধু একটি সুযোগ চেয়েছিল, সেই ছেলেটিই আজ জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখন তার প্রয়োজন আরেকটি সুযোগ—উচ্চশিক্ষার সুযোগ।
তাওহীদের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়, সেজন্য সমাজের বিত্তবান, শিক্ষানুরাগী, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও মানবিক মানুষের প্রতি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। কোনো একজন হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তাওহীদের কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনার দায়িত্ব নেন, তাহলে হয়তো বদলে যেতে পারে তার পুরো জীবন। আজ যে তাওহীদ একটি দরিদ্র ঘরে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে, সুযোগ পেলে সেই তাওহীদই একদিন তার পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
অভাবের ঘরে জন্ম নেওয়া তাওহীদ আজ মেধার আলোয় নিজের পরিচয় তৈরি করেছে। তার সাফল্য প্রমাণ করেছে, প্রতিভা কখনো দরিদ্র-ধনী দেখে জন্ম নেয় না; শুধু প্রয়োজন সুযোগের। এখন সেই সুযোগটুকু করে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
আঁধার ঘরের এই আলো যেন অর্থের অভাবে নিভে না যায়।
রাহাদ সুমন,বরিশাল
তারিখ:১২-০৮-২০২৬ইং