এক যুগের অপেক্ষার অবসান: কালীগঞ্জ থেকে ঢাকায় সরাসরি বাস, স্বস্তির নিশ্বাস হাজারো মানুষের

আপলোড সময় : ০৩-০৮-২০২৬ ০৫:৫৯:১৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৮-২০২৬ ০৬:০১:৪৬ অপরাহ্ন
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি


ভোরের আলো ফুটতেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী আর ব্যবসায়ীরা। গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। কিন্তু যাত্রা শুরু মানেই ছিল অনিশ্চয়তার গল্প-একবার বাস, তারপর লেগুনা, আবার অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো যানবাহন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, অতিরিক্ত ভাড়া গুনে ক্লান্ত হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো-এ যেন ছিল কালীগঞ্জবাসীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। রাজধানী থেকে মাত্র অল্প দূরত্বে অবস্থান করেও সরাসরি বাস সার্ভিসের অভাবে বছরের পর বছর এই দুর্ভোগ বয়ে বেড়িয়েছেন উপজেলার মানুষ। অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকায় উদ্বোধন করা হয় কালীগঞ্জ-গুলিস্তান সরাসরি কেটিএল (কালীগঞ্জ ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড) বাস সার্ভিসের। স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক মিলন প্রধান অতিথি হিসেবে ফিতা কেটে এ সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।


উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলাম, কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন, বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, বাস মালিক, পরিবহন শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেটিএল পরিবহন সূত্র জানায়, প্রতিদিন ৩৫টি বাস দেওপাড়া ফেরিঘাট থেকে কালীগঞ্জ বাজার, টঙ্গী ও আব্দুল্লাহপুর হয়ে সরাসরি গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করবে। এতে প্রতিদিন রাজধানীমুখী হাজারো যাত্রীর সময়, খরচ এবং ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। কালীগঞ্জে সরাসরি বাস চালুর দাবি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী এ দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সচেতন নাগরিক মাসুদ আখন্দ স্থানীয় সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সরাসরি বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি উত্তরা, বিমানবন্দর ও মহাখালী হয়ে বিআরটিসির এসি ও নন-এসি বাস সার্ভিস চালুরও দাবি জানান, যাতে শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের যাতায়াত আরও সহজ হয়। এতদিন সরাসরি বাস না থাকায় যাত্রীদের পথে একাধিকবার যানবাহন বদলাতে হতো। এতে সময় যেমন নষ্ট হতো, তেমনি গুনতে হতো অতিরিক্ত ভাড়া। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ইডেন মহিলা কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা।



স্থানীয় ব্যবসায়ী সোহেল আহমেদ বলেন, "রাজধানীর এত কাছে থেকেও যাতায়াতের ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম। সরাসরি বাস চালু হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন চলাচল অনেক সহজ হবে।" স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা সরকার বলেন, "কালীগঞ্জের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল সরাসরি বাস সার্ভিস। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়েছে। আমরা সত্যিই আনন্দিত।" স্বেচ্ছাসেবক কাজী জাহেদ হাসান বলেন, "বাস সার্ভিস চালু হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে স্থায়ী সুফল পেতে কালীগঞ্জ-টঙ্গী-ঘোড়াশাল আঞ্চলিক সড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করা জরুরি। বিশেষ করে কাপাসিয়া রোড এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।" কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, কেটিএল পরিবহনের যাত্রা শুরু কালীগঞ্জবাসীর জন্য আনন্দ ও স্বস্তির খবর। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সার্ভিস মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত ভোগান্তি অনেকটাই কমিয়ে দেবে। তিনি বাস মালিক ও সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং আস্থা নিশ্চিত করতে সব নিয়ম-নীতি মেনে শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে বাস পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক মিলন বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে কালীগঞ্জ-ঢাকা রুটে কেটিএল পরিবহনের বাস চলাচল করত। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে সেই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, "প্রায় দেড় বছর আগে বাস মালিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা আমার সঙ্গে সরাসরি বাস চালুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ কেটিএল পরিবহনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কালীগঞ্জবাসীর বহুদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলো। আমি বিশ্বাস করি, এই সার্ভিস মানুষের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনবে।" স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের আগে কালীগঞ্জ ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের কিছু বাস এ রুটে চলাচল করত। পরে নানা প্রতিকূলতা ও সংকটের কারণে সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অবশেষে প্রায় এক যুগ পর নতুন করে কেটিএল পরিবহনের যাত্রা শুরু হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরে এসেছে স্বস্তি। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি বাস সার্ভিস চালুর ঘটনা নয়; এটি কালীগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন অধ্যায়।


নিয়মিত ও মানসম্মতভাবে এই সেবা পরিচালিত হলে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিনের একটি জনদাবি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কালীগঞ্জ যেন নতুন করে রাজধানীর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলো। মানুষের প্রত্যাশা-এই যাত্রা শুধু বাসের নয়, উন্নয়ন ও সম্ভাবনারও; যে যাত্রা ভবিষ্যতে কালীগঞ্জকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। ###

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]