আমার ছেলেটা শুধু ছেলে ছিল না, আমার বন্ধু ছিল’—শহীদ রাজিবের স্মৃতিতে অশ্রুসিক্ত এক বিকেল

আপলোড সময় : ০৩-০৮-২০২৬ ১২:৩৭:৫৫ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৮-২০২৬ ১২:৪৩:০৭ পূর্বাহ্ন
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-



বাড়ির উঠানে পা রাখতেই যেন নেমে আসে নীরবতা। দেয়ালের ফ্রেমে বাঁধানো একটি হাসিমাখা মুখ, ঘরের এক কোণে যত্নে রাখা স্মৃতিচিহ্ন, আর মাঝখানে বসে থাকা এক মা—যিনি ছেলের কথা বলতে শুরু করতেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। “ও শুধু আমার ছেলে ছিল না, ও ছিল আমার স্বপ্ন…,” কথাগুলো শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদ মো. রাজিব উল করিম সরকার–এর মা জান্নাতুল ফেরদৌস। উপস্থিত সবাই কিছু সময়ের জন্য নির্বাক হয়ে যান। কেউ তাকে সান্ত্বনা দেন, কেউ নীরবে চোখের পানি মুছে নেন। শনিবার বিকেলে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের জয়কুমর গ্রামে শহীদ রাজিবের বাড়িতে যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আহ্বায়ক মোঃ লোকমান হোসেন লিমন, ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মোঃ সাজ্জাদ হোসেন সোহান, মুখপাত্র মোছাঃ জান্নাতুল ফেরদৌস মিম, যুগ্ম সদস্য সচিব মোঃ আতাউর রহমান আতাসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।


তাদের সঙ্গে ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ও জেলা মহিলা দলের সেক্রেটারি মিলি কায়কোবাদ, জুলাই আন্দোলনে আহত যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম পৌর মহিলা দলের আহ্বায়ক লাবনী এবং রাজারহাট মহিলা দলের আহ্বায়ক হাওয়া। শহীদ পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের কথা শোনা এবং পাশে থাকার বার্তা দিতেই এ সফর। হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নবাজ তরুণ:- কুড়িগ্রামের সন্তান মোঃ রাজিব উল করিম সরকার। বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে লালমনিরহাটে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি স্কাউটিংয়েও ছিলেন অসাধারণ। অর্জন করেছিলেন প্রেসিডেন্টস স্কাউট অ্যাওয়ার্ড। লালমনিরহাট সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় এইচএসসি পরীক্ষার সাতটি পরীক্ষা শেষ করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। শহীদ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে মাকে বলেছিলেন, একদিন নিজের হাতে পরিবারের জন্য সুন্দর একটি বাড়ির নকশা তৈরি করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি:- পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন রাজিব। ৫ আগস্ট লালমনিরহাটের মিশন মোড়ে অবস্থান নেওয়ার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মা মোছাঃ জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, রাত প্রায় ১১টার পর থেকে ছেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলেকে খুঁজে দেওয়ার আবেদনও জানান। রাত দেড়টার দিকে স্বজনের ফোনে আসে সেই ভয়াবহ সংবাদ—রাজিব আর নেই। পরিবারের দাবি, পরে তাকে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ সুমন খানের বাসা থেকে আগুনে পোড়া মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আর কোনো মাকে যেন এমন দিন দেখতে না হয়:- স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন রাজিবের মা। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে মানুষের মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন কখনো বিস্মৃত না হয়। তিনি দেশের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মাকে আর সন্তানের লাশের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। রাজিবের বাবা রেজাউল করিম সরকার, লালমনিরহাটের বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। ছেলের কথা বলতে গিয়ে তিনিও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “ও শুধু আমার ছেলে ছিল না, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। ছোটবেলা থেকে নিজের হাতে মানুষ করেছি। স্কুলে নেওয়া, গোসল করানো, পড়ানো—সবই করেছি। আজ সব স্মৃতি বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।" ভাইদের চোখেও একই শূন্যতা:- ছোট ভাই মোঃ মেজবাহ উল করিম সরকার বলেন, বড় ভাইয়ের সঙ্গে মাছ চাষ, পাখি পালনসহ নানা কাজ করতেন। প্রকাশ্যে কান্না করতে না পারলেও ভেতরে ভেতরে প্রতিদিনই ভাইকে মনে করে কাঁদেন। মেজো ভাই মোঃ জামিউল করিম সরকার জানান, বড় ভাই তাদের আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছিলেন। পরে সংবাদমাধ্যম ও ফেসবুক লাইভে রাজিবকে আন্দোলনের সামনের সারিতে দেখে তারা বুঝতে পারেন, তিনি দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন বলেন, “আমরা পর্যায়ক্রমে সব শহীদ পরিবারের কাছে যাচ্ছি। তাদের কষ্টের কথা শুনছি, পাশে থাকার চেষ্টা করছি। প্রতিটি পরিবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই স্বাধীনতার মূল্য কত বড়।” তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুড়িগ্রামে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৩৪ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।


রাজারহাট উপজেলায় আহত হয়েছেন ১৪ জন এবং শহীদ হয়েছেন একজন—রাজিব উল করিম সরকার। সারা দেশে স্কাউটের ৯ জন শহীদের একজনও তিনি। সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মোঃ সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, শহীদদের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের আত্মত্যাগ পৌঁছে দেওয়া সবার দায়িত্ব। সফরের সময় স্থানীয়রা শহীদ রাজিবের এলাকার একটি মসজিদের নির্মাণকাজে সহযোগিতার আবেদন জানান। এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা মহিলা দলের সেক্রেটারি মিলি কায়কোবাদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতার চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন। একটি ঘর, কিছু অমলিন স্মৃতি আর অশ্রুসিক্ত একটি পরিবার—সব মিলিয়ে শহীদ রাজিবের বাড়ির সেই বিকেল যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল্য আরেকবার মনে করিয়ে দিল। স্বপ্নবাজ এক তরুণের অসমাপ্ত পথচলা আজও তার বাবা-মায়ের চোখের জলে, ভাইদের নীরবতায় এবং তাকে স্মরণ করতে আসা মানুষের শ্রদ্ধায় বেঁচে আছে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]