মোঃ আব্দুল্লাহ আল মুকিম রাজু
পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড় সদর উপজেলার ১ নম্বর অমরখানা ইউনিয়নের ভিতরগড় গ্রামের মহারাজা দিঘীতে পানিতে ভেসে থাকা অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে জেলা পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের আপন বড় বোন মোছা. সমলা আক্তার (২৪)-কে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ দুপুর আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটে স্থানীয় লোকজন মহারাজা দিঘীর পানিতে চিৎ হয়ে ভেসে থাকা একটি লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), সিআইডি ফরেনসিক টিম ও পিবিআই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে রহস্য উদ্ঘাটন এবং লাশের পরিচয় শনাক্তের কাজ শুরু করে।
পরবর্তীতে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি মো. মানিক হোসেন (১৯), পিতা- রইস উদ্দীন, সাং- মালাদাম, থানা ও জেলা- পঞ্চগড়। পঞ্চগড় সদর থানা সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য লাশ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে পঞ্চগড় সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ সুপারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি চৌকস দল তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালে নিহতের পরিহিত প্যান্টের সঙ্গে পলিথিনে মোড়ানো একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। ওই চিরকুটের সূত্র ধরে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার একপর্যায়ে নিহতের বড় বোন সমলা আক্তারের শয়নকক্ষে তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটের লেখার সঙ্গে হুবহু (কনটেন্টযুক্ত) লেখা সম্বলিত একটি ক্যালেন্ডার উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সেটি জব্দ করা হয়।
পরবর্তীতে সমলা আক্তারকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের প্রেস ব্রিফিং অনুযায়ী, সমলা আক্তার জানান, নিহত মানিক তার আপন ছোট ভাই। এর আগে তার দুইবার বিয়ে হয়েছিল এবং তার দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে তিনি তৃতীয়বার বিয়ে করেন। বিয়ের পরও তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করতেন এবং তার তৃতীয় স্বামী তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, প্রায় তিন থেকে চার মাস আগে মানিক জোরপূর্বক তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং গোপনে ভিডিও ধারণ করে। পরে সেই ভিডিও স্বামীর কাছে দেখিয়ে সংসার নষ্ট করার ভয় দেখিয়ে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করত বলে সমলা আক্তার জিজ্ঞাসাবাদে জানান। বিষয়টি তিনি পরে তার স্বামীকে অবহিত করেন।
পুলিশ জানায়, গত ১২ জুলাই প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশীদের ওপর দোষ চাপানোর পরিকল্পনা করেন সমলা আক্তার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৩ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে তিনি মানিককে কৌশলে মহারাজা দিঘী এলাকায় নিয়ে যান। পরে একটি বাড়িতে পৌঁছে মানিক তার সঙ্গে পুনরায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।
এরপর তারা মহারাজা দিঘীর পাশের একটি হোটেলে বসেন। সেখানে সমলা আক্তার কৌশলে মানিকের খাবার পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন। রাত আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে মানিকের ঘুমের ভাব এলে তাকে নিয়ে মহারাজা দিঘীর পশ্চিম পাড়ে যান। সেখানে মানিকের পকেটে থাকা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দিঘীর পানিতে ফেলে দেন এবং বাড়ি থেকে লিখে নিয়ে যাওয়া একটি চিরকুট পলিথিনে ভরে তার কোমরে গুঁজে দিয়ে রাস্তায় গিয়ে খুনির জন্য অপেক্ষা করেন বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।
কিছুক্ষণ পর খুনি এসে মানিককে হত্যা করে মহারাজা দিঘীর পানিতে ফেলে দেয়। পরে রাত আনুমানিক ১টার দিকে সমলা আক্তার ও খুনি বাড়িতে ফিরে যায়। তদন্ত চলাকালে নিহত মানিকের কোমরে পাওয়া চিরকুটের হুবহু লেখা এবং তার দ্বিতীয় বাটন ফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
এছাড়া গ্রেফতারকৃত সমলা আক্তারকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।