বন্যার জন্য দায়ী কে—প্রতিবেশী রাষ্ট্র, সরকার, কর্মকর্তা নাকি আমরা নিজেরাই?

আপলোড সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ০৮:৪২:২৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ০৮:৪৫:০৪ অপরাহ্ন
খুলনা প্রতিনিধি


মোঃ রাজিবুল হোসেন তানিম বাংলাদেশে বন্যা যেন আর কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং প্রতি বছরের বাস্তবতা। একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং উজানের পানি। প্রতিবছরই হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি হারায়, কৃষক ফসল হারান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, আর ক্ষতির হিসাব গিয়ে দাঁড়ায় হাজার হাজার কোটি টাকায়। সাম্প্রতিক বন্যাতেও লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে।


আমরা অনেক সময় খুব সহজ একটি উত্তর খুঁজে নিই। কেউ বলেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র দায়ী, কেউ সরকারের ব্যর্থতাকে দোষ দেন, আবার কেউ শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত বড় একটি সমস্যার জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করলে সমাধান কখনোই আসবে না। এই বিষয়ে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষক জনাব মো: নাজমুল হক বলেন, সরকার প্রতিবছর নদীর বাঁধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।


তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, অনেক বাঁধ কয়েক বছরের মধ্যেই কেন দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নির্মাণমান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হয়। বিদেশের নাগরিকদের শৃঙ্খলিত জীবনের সাথে তুলনা করে এই শিক্ষক আরো বলেন, আমাদের আরও একটি ভুল ধারণা আছে, আমরা ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত অবকাঠামো চাই, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই মানসিকতা গড়ে তুলতে চাই না। উন্নত দেশগুলো শুধু সরকারের কারণে উন্নত হয়নি; সেখানে নাগরিকরাও আইন মেনে চলেন, পরিবেশ রক্ষা করেন এবং জনসম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করেন।


প্রতিদিন শহর ও গ্রামের অসংখ্য মানুষ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, গৃহস্থালির বর্জ্য ড্রেন, নালা ও খালে ফেলে দিচ্ছি। ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অনেক খাল দখল হয়েছে, অনেক জলাধার বিলীন হয়েছে। পানি চলার পথ যখন আমরা নিজেরাই বন্ধ করে দিই, তখন অতিবৃষ্টি হলে সেই পানি কোথায় যাবে? শেষ পর্যন্ত সেটি আমাদের বাড়ি, রাস্তা ও শহরেই ফিরে আসে। দেশের বিভিন্ন শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ভরাট এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির সমাধান হিসেবে সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক জনাব নাজমুল হক বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের কাজ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী, খাল ও জলাধার দখলমুক্ত করতে হবে এবং নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।


প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকেও কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে, যাতে উজানের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সময়মতো সমন্বয় করা যায়। সবশেষে, আমাদের প্রত্যেককে নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাস্তা, খাল বা ড্রেনে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে হবে এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ দখল বা নষ্ট করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]