পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি ৪২ মিটার সেতুর নির্মাণকাজ: ড্রামের ভেলায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে ২০ হাজার মানুষ

আপলোড সময় : ১১-০৭-২০২৬ ০৯:৩৭:৫৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-০৭-২০২৬ ০৯:৩৭:৫৩ অপরাহ্ন
 
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোচাবাড়ী তালেরতল এলাকায় নির্মাণাধীন ৪২ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের বহু পরে গিয়েও নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় ছড়া পারাপার করছেন। এতে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডসহ জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে তালেরতল এলাকার পুরোনো সেতুটি ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে সময় এলাকাবাসীর চলাচলের জন্য অস্থায়ীভাবে দড়ি ও কাঠের সাঁকোর ব্যবস্থা করা হয়। পরে ২০১৯ সালের বন্যায় সেতুর দুই পাশের মাটিও আবার ভেঙে যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২১ সালে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও আজও তা সম্পন্ন হয়নি।
 
স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে এবং ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার তিন বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি এখনো অসমাপ্ত রয়েছে।
 
সরেজমিনে দেখা যায়, তিনটি স্প্যানের মধ্যে মাত্র একটি স্প্যানের ডেক (স্ল্যাব) নির্মাণ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি স্প্যানের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে দ্রুত সেতুর কাজ সম্পন্ন করা হোক।
 
সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষ প্রতিদিন পাশের অস্থায়ী ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পারাপার করছেন। বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। প্রায়ই ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যায়। অনেক সময় শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধরা আতঙ্কের কারণে পারাপার করতেই সাহস পান না।
 
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার কিংবা উপজেলা সদরে যেতে হলে এই ছড়া পার হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। বিকল্প হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) একটি রক্ষা বাঁধ থাকলেও সেটি অনেক দূরের পথ এবং চলাচলের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। বর্তমানে ওই বাঁধেরও মেরামতকাজ চলায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
 
কৃষকদের ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ছোট ছোট ভেলা বা ড্রামের ভেলায় করে বাড়িতে আনতে হচ্ছে। একইভাবে গবাদিপশুও পারাপার করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
 
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, খোচাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পার হতে হয়। বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অনেক সময় ড্রামের ভেলায় ওঠানামার সময় পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
 
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মোঃ মতিয়ার সরকার বলেন, “প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই ছড়া পারাপারে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও কৃষিক্ষেত্রে পড়ছে। আমার প্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় ঝুঁকির কারণে নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হতে পারে না। চার বছর আগে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও কাজের অগ্রগতি খুবই ধীর। আমরা দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানাচ্ছি।”
 
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোঃ আব্দুল মালেক বলেন, “সেতুর কাজ শুরু হলেও মানুষের পারাপারের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি একটি ড্রামের ভেলা তৈরি করেছি। কিন্তু এটি দিয়ে এত মানুষের নিরাপদ পারাপার সম্ভব নয়। ঠিকাদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাইনি। উল্টো আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
 
নদীপাড় এলাকার বাসিন্দা মোঃ রুহুল আমিন সর্দার বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই ড্রামের ভেলায় পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যায়। সাইকেল, মোটরসাইকেল, টাকা-পয়সাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পানিতে ভিজে যায়। গবাদিপশুও ভেলায় করে পারাপার করতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঈদের সময় ঈদগাহে যেতেও একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পার হতে হচ্ছে।”
 
এ বিষয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় তারা চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি বিলম্বের কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
 
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, “মাত্র একটি স্প্যান নির্মাণ করতেই যদি পাঁচ বছর লেগে যায়, তাহলে পুরো সেতুর কাজ শেষ হতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?”

 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]