জুলাই বিপ্লবোত্তর শিক্ষা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা”- শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

আপলোড সময় : ১১-০৭-২০২৬ ০৯:০৬:২১ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-০৭-২০২৬ ০৯:০৯:৩১ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক 


জুলাই বিপ্লবোত্তর শিক্ষা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা”- শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উদ্যোগে “জুলাই বিপ্লবোত্তর শিক্ষা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা”- শীর্ষক সেমিনার শনিবার (১১ জুলাই) বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উপদেষ্টা ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হাসান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে আমাদের আত্মপরিচয় বিলীন করা হয়েছে।


তিনি আরও বলেন, "ধর্ম পছন্দ করে না এমন একটা গোষ্ঠী আমাদের প্রশাসনে বিচরণ করছে"। আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুকরণের মাধ্যমে শিক্ষাখাতে আমূল সংস্কার করতে হবে। সেমিনারে প্রধান বক্তা দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, হিউম্যান রিসোর্সের জন্য অবশ্যই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষকে হিউম্যান রিসোর্স (মানব সম্পদ) হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে, বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য বন্ধ করে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।


শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম উপকরণ হচ্ছে বই। তাই সকল সেক্টরের পৃথক পৃথক বই লেখা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষকদের রাজনীতি করণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ শিক্ষকরা রাজনীতিতে যুক্ত থাকলে শিক্ষক নিয়োগে, ভিসি নিয়োগে দলীয়করণ করা হয়৷ ফলে অযোগ্যরা নিয়োগ পেয়ে যায়। যোগ্যরা নিয়োগ বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব শুধু ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে হয়নি বরং বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধেও এই বিপ্লব। এই বিপ্লব বিদেশি সহায়তা ছাড়া নিজস্ব শক্তিতে সংঘটিত হয়েছে। ফলে আগামী প্রজন্মকে কেউ বলতে পারবে না তোমাদের ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিপ্লব আমাদের সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছে। তাই আগামীতে আমাদের আরো শক্তিশালী প্রজন্ম তৈরি হবে। সেই প্রজন্মকে ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের বিকল্প নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ইলিয়াস মোল্লা এমপি বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্যহীন। তাই লক্ষ্য স্থির করে আমাদের শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করতে হবে।


তিনি আরও বলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্ম যাদের কাছে ন্যায় বিচার চেয়েছে তাদের নিজেদেরই ইনসাফের জ্ঞান নাই। জাস্টিস বিহীন নেতৃত্বের কাছে ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে না। এজন্য এমন প্রজন্ম ও নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে যাদের মাঝে ইনসাফ ও জাস্টিসের জ্ঞান থাকবে। সেজন্য শিক্ষাখাতে সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, ১৯৫ টি দেশের মধ্যে আমরা ১২২ তম। এটি ক্রমেই ১৯৫ এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব হবে যদি সরকার দেশ গড়তে চায়। সরকারের স্বদিচ্ছা ব্যতিত রাষ্ট্র সংস্কার সহজ নয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে শুধু টাকা পাচার হয়নি, মেধাও পাচার হয়ে গেছে। এর একমাত্র কারণ কোনো সরকার মেধার মূল্যায়ন করেনি। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ আর কোটা নীতিতে দেশ পরিচালিত হলে মেধা পাচার বন্ধ করা যাবে না। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা মুখে যা বলেন কাজ করে তার বিপরীতটা। তিনি পালাবেন না বলে পালিয়ে গেছে সুতারাং দেশে আসবেন বললে সেটিও তার উল্টোটাই হবে। তবে শেখ হাসিনা যদি কখনো দেশে ফিরে আসে সেটি স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় নয় বরং জনগণের চাপে সরকার তাকে আনতে বাধ্য হলেই তিনি দেশে আসবেন। এছাড়া শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার সৎ সাহস নেই।


কারণ শেখ হাসিনা জানে জীবনে যত মানুষ তিনি হত্যা করিয়েছেন তার দায় তিনি এড়াতে পারবেন না। শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ রোকেয়া বেগম বলেন, দেশ সংস্কার ব্যতিত শিক্ষা সংস্কার হবে না। তিনি বলেন, শহীদ জাবের ইব্রাহিম সহ জুলাইয়ের শহীদ এবং আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারীরা রাষ্ট্র সংস্কার চেয়েছে, সংশোধন নয়। তাই সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিরোধী দল সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নয় এটি ছিল জুলাই বিপ্লব। তবে এই বিপ্লব শেষ হয়নি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা ড্যামেজ হয়ে গেছে। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা হাজার-হাজার শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞাপ্তিতে পিয়ন পদে আবেদন করেছে! এটি জাতির জন্য লজ্জার। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কী?- যেখানে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েট অর্জন করে পিয়ন পদে চাকুরির পিছনে ছুটতে হয়। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, উন্নত বিশ্বে শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় প্রেসকিপশনে আওয়ামী লীগ তৈরি করেছে। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় কেবলমাত্র কেরানি তৈরি হবে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন সরকার ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যেখানে এক পয়সাও গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়নি! তাহলে এই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে গ্রাজুয়েট অর্জন করে নেতার পিছনে, প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির পেছনে দৌঁড়ানো ব্যতিত কিছুই কী করা যাবে? তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডাকসু শিক্ষার্থীদের কল্যাণে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেসব প্রকল্প নতুন সরকার বাতিল করে দিয়েছে! পুরোনো ফ্যাসিবাদী রাজনীতি চর্চা না করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, হয়তো আপনারা কাজ করুন, নয়তো আমাদের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করবেন না। আমাদেরকে বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে দিন। লেখক ও ইসলামিক চিন্তাবিদ মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, এমন একটা শিক্ষা নীতি প্রয়োজন যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। তিনি বলেন, দেখা যায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সমাজের তৃতীয় শ্রেণীর মনে করা হয়! এখfন থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে কুরআন ও হাদিস শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কওমি মাদ্রাসা সেক্টরের শিক্ষার্থীরা যেই শৃঙ্খলার মধ্যে গড়ে ওঠে সেটি সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার মতোই। তাই এই সেক্টরের শিক্ষার্থীদের কাজে লাগাতে সরকারকে উদ্যোগ হতে হবে। সেমিনারের শুরুতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক। বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যাপক রবিউল ইসলামের পরিচালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম, তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, মানুষ যা বলে, সেটি না করা আল্লাহর কাছে অপছন্দ। তাই মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে, মুখে যা বলবে কাজে তাই করবে। তিনি আরও বলেন, যেই শিক্ষা গ্রহন করলে জাহান্নামে যেতে হবে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশ থেকে উৎখাত করতে হবে। ঐ শিক্ষা আমরা গ্রহন করবো যেই শিক্ষা গ্রহন করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে। দুনিয়া এবং আখিরাতে কল্যাণ হবে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এমন সব বই ও প্রবন্ধ শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়েছে যেগুলো মানুষকে জাহান্নামের দিকে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নামাজ চালু করে মানুষের চরিত্র উন্নত করতে হবে, যাকাত চালু করে ক্ষুধা দারিদ্র্য বেকারত্ব দূর করতে হবে, ভালো কাজের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং খারাপ কাজ বন্ধ করে মানুষকে অশান্তির হাত থেকে রক্ষা করবো। তিনি বলেন, কুরআনের শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করতে হবে। কুরআনের শিক্ষা ব্যতিত সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দলীয় লোকজনকে শিক্ষা ব্যবস্থায় পুনর্বাসনে বেশি মনোযোগী। ফলে যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোকদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পুনর্বাসন অব্যাহত থাকলে জাতি মেরুদণ্ডহীন শিক্ষা ছাড়া কিছুই পাবে না। শিক্ষার প্রতিটি লেভেলে একজন করে কুরআন শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। ইসলামিক স্টাডিজকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রাখা ফাঁকিবাজি উল্লেখ করে তিনি বলেন ফাঁকিবাজি শিক্ষা জাতি চায় না। ইসলামিক স্টাডিজকে ঐচ্ছিক বিষয়ের পরিবর্তে আবশ্যিক বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. শামীম উদ্দিন খান, বাংলাদেশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ড. আবুল কালাম পাটোয়ারী, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নুরু নবী মানিক, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলনা ফারুক আহমেদ, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ সৈয়দ আব্দুল আজিজ, বাংলাদেশ মাধ্যমিক স্কুল পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ মনজুরুল হক, বাংলাদেশ প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক পরিষদের সভাপতি ড. সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। বার্তা প্রেরক (অধ্যাপক রবিউল ইসলাম) সভাপতি ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]