নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর ওয়ারী থানার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সিলভারডেল প্রিপারেটরী অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুল’। একসময় শিক্ষার মান ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসাবে সুপরিচিত থাকলেও, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে চলছে তীব্র অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক কেলেঙ্কারির মহোৎসব। আর এই সমস্ত অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্কুলটির বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো: সাইদুর রহমান সরকার। ১৯৯৬ সালে বিধি-বহির্ভূতভাবে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে বর্তমানে তিনি স্কুলটিকে নিজের ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে’ পরিণত করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) কর্তৃক প্রকাশিত জাল সনদ, ভুয়া নিয়োগ ও অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৪৬৪ নম্বরে নাম এসেছে এই সিলভারডেল প্রিপারেটরী অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলের।
নিয়োগে শুভঙ্করের ফাঁকি
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইদুর রহমান সরকার অত্র স্কুলের প্রিপারেটরী নন-এমপিও শাখার একজন কেরানী (অফিস সহকারী) হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি নিয়ম-বহির্ভূত উপায়ে স্কুলের মাধ্যমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত হন।
বেসরকারি শিক্ষক নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পূর্বে দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং নিয়োগ বোর্ডে মহাপরিচলকের (ডিজি) প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক। যদিও তিনি দাবি করেছেন, ০১/০৩/১৯৯৬ তারিখে ‘দৈনিক খবর’ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় কিন্তু বিজ্ঞপ্তি নিয়েও আছে কারচুপির অভিযোগ। তবে শিক্ষক-কর্মচারী বিবরণীতে দেখা যায় তার যোগদানের তারিখ ০১/১১/১৯৯৫ সালে, এখন প্রশ্ন উঠেছে সার্কুলারের আগে যোগদান হয় কিভাবে!!। ফলে তার নিয়োগটি শুরু থেকেই আইনগতভাবে অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ।
০১লা মার্চ ১৯৯৬ সালের সার্কুলারে বলা হয়েছে, বানিজ্য বিভাগের শিক্ষক আবশ্যক এবং ১৯৯৬ সালেই তার নিয়োগ হয়। অথচ উচ্চ মাধ্যমিকে বানিজ্য বিভাগ অনুমোদন পেয়েছে ২০১০ সালে। তাহলে তিনি বানিজ্য বিভাগে নিয়োগ কিভাবে পেলেন।
ক্লাস নেন না ১০ বছর, হুমকির মুখে সাধারণ শিক্ষকেরা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ এর ৭.৫.২ অনুযায়ী, একজন প্রধান শিক্ষকের সপ্তাহে কমপক্ষে ৫টি ক্লাস নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর গত ১০ বছরে তিনি একটি ক্লাসও নেননি।
স্কুলে স্থায়ী শিক্ষকের শূন্যতা থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত স্বার্থে এনটিআরসিএ-তে (NTRCA) চাহিদাপত্র না পাঠিয়ে গেস্ট টিচার (খণ্ডকালীন শিক্ষক) দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করছেন। এর প্রতিবাদ করলেই সাধারণ শিক্ষকদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া এবং নারীঘটিত বিষয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ংকর হুমকি দেওয়া হয় বলে কতিপয় শিক্ষক জানান।
তিনি প্রকাশ্যেই গর্ব করে বলেন, "আমি এই স্কুলের কেরানী ছিলাম, সেখান থেকে প্রধান শিক্ষক হয়েছি। বর্তমানে আমি ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র আহ্বায়ক। আওয়ামী আমলে নিয়োগ পেলেও এখন বিএনপির বড় বড় নেতাদের সাথে আমার উঠাবসা। কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না।"
শিক্ষার্থীদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে
প্রধান শিক্ষকের চূড়ান্ত অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে খোদ শিক্ষার্থীরাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। জানা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া দুজন শিক্ষার্থী তার চরম অবহেলার কারণে সরকারি আর্থিক সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছে। ভুক্তভোগী ওই দুই শিক্ষার্থী বর্তমানে বিদ্যালয়টির নবম 'এ' এবং নবম 'বি' শাখায় অধ্যয়নরত রয়েছে।
শুধু তাই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সহায়তার বিশেষ সুযোগ বা অনুদান আসলেও, সেগুলোর প্রতি কোনো ধরনের ভ্রুক্ষেপ বা উদ্যোগ নেন না এই প্রধান শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের এসব মৌলিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার দেখভাল করার চেয়ে তিনি সবসময় নিজের 'বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি'র কার্যক্রম ও রাজনৈতিক তদ্বির নিয়েই ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাইড বই বাণিজ্য ও অতিরিক্ত ফি আদায়
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা মোসা: আফরোজা আঞ্জুম কাকলী ম্যাডামের নেতৃত্বে স্কুলে ‘অক্ষরপত্র প্রকাশনী’র বাংলা ও ইংরেজি গাইড বই কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয়। এই বই বিক্রির লভ্যাংশ তাদের নিজস্ব কোরামের শিক্ষকরা ভাগবাটোয়ারা করে নেন।
এছাড়াও, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষার পর জোরপূর্বক টাকার বিনিময়ে কোচিং করতে বাধ্য করা এবং অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপ করানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, গত ১০ বছরে এসএসসি পরিক্ষায় কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সার্টিফিকেট বাবদ নিয়েছেন রিসিট বিহীন লক্ষ লক্ষ টাকা,যার কোন সঠিক হদিস নেই। গত দশ বছরে আনুমানি ৮০০-১২০০ শিক্ষার্থী অত্র স্কুল থেকে কৃতকার্য হয়েছেন এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে গড়ে কমপক্ষে ২০০-৫০০ টাকা করে নিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাভক বলেন, শিক্ষার্থীরা স্কুলের বিষয়ে তার কাছে কোন সমস্যা নিয়ে গেলে, তিনি কখনই তার সমাধান করেন নি। এবং কখনো ক্লাসও নেয়নি।
আরেক জন অভিভাবক অভিযোগের সুরে বলেন, অত্র স্কুলের কোন কোন শিক্ষক কোচিং ব্যবসার সাথে জড়িত, কিন্তু প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করলেও তিনি তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেন না।
তার কথা ধরেই আরেক অভিভাবক বলেন, তিনিতো তাদের কাছ থেকে পার্সেন্টিজ পান। এবং তিনি আরো বলেন চলতি বছরে স্কুলের টিউশন ফি হুট প্রায় দ্বিগুন করে ফেলেছে।
১৩৫-১৪০% বেতন ও আর্থিক হরিলুট
২০০৬ সালের পূর্বে সরকার যখন মূল বেতনের ৮০% দিত, তখন স্কুল বাকি ২০% দিয়ে শিক্ষকদের বেতন সমন্বয় করত। কিন্তু ২০০৬ সালে সরকার শতভাগ (১০০%) বেতন দেওয়া শুরু করার পরও, প্রধান শিক্ষক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে ভুল বুঝিয়ে স্কুল ফান্ড থেকে অতিরিক্ত ২০% টাকা নেওয়া অব্যাহত রাখেন, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫-৪০ শতাংশে।
এর ফলে প্রধান শিক্ষক এবং তার অনুগত কতিপয় শিক্ষক প্রতি মাসে সরকারি ও স্কুলের ফান্ড মিলিয়ে মোট ১৩৫-১৪০% বেতন এবং দুই ঈদেও সমপরিমাণ বোনাস তুলছেন, যা সম্পূর্ণ নীতি-বহির্ভূত। স্কুলের বেতন বহি এবং রেজিস্টার খাতা খতিয়ে দেখলেই এই অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন শিক্ষকদের স্থায়ী করার নামে মনগড়া মৌখিক আইন তৈরি করে তাদের ন্যায্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।
ভুয়া ভাউচারে ফান্ড আত্মসাৎ
বিগত ১০ বছরে স্কুল ফান্ড থেকে নামে-বেনামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অনেক ভাউচারের সাথে বাস্তব কাজের কোনো মিল নেই। ক্যাশলেস বা রসিদবিহীন লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। প্রতি মাসে সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা তিনি স্কুল থেকে অতিরিক্ত সুবিধা নেন, অথচ ম্যানেজিং কমিটির দোহাই দিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখেন।
প্রধান শিক্ষকের এই লাগামহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কারণে ঐতিহ্যবাহী সিলভারডেল প্রিপারেটরী অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষার মান যেমন তলানিতে ঠেকেছে, তেমনি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষকমহল এই প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য দূর করতে এবং অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
যোগাযোগ করা হলে উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আসলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রমনা থানার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, আমিতো ১০ (দশ) বছর যাবত এখানে কর্মরত আছি। কিন্তু আমার কাছে এ বিষয়ে কোন অভিযোগ আসেনি। পরবর্তীতে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইদুর রহমান সরকার বলেন, সকল তথ্য ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। তবে তিনি অধিকাংশ প্রশ্নেরই কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইদুর রহমান সরকার এর অবৈধ অর্থ সম্পদ নিয়ে ২য় পর্বে আসছে ভিডিও নিউজ