সাত বছরের অধ্যবসায়ে প্রশাসন ক্যাডারে রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল মতিন

আপলোড সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ০৯:৫৭:৩৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ১০:৩২:২৫ অপরাহ্ন
ইসরাত জেরিন, রাজশাহী কলেজ প্রতিনিধি:


অসংখ্য ব্যর্থতা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা, হতাশার মুহূর্ত আর নিরলস পরিশ্রম সবকিছুকে জয় করে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন রাজশাহী কলেজের রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. আব্দুল মতিন।


প্রায় সাত বছরের অধ্যবসায়ের পর তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাজশাহীর পবা উপজেলার শিলিন্দা গ্রামের সাধারণ পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আব্দুল মতিনের। বাবা মো. জারমান আলী। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সরকারি প্রশাসনের মাধ্যমে মানুষের সেবা করবেন। সেই স্বপ্ন পূরণে একের পর এক ব্যর্থতা, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, চাকরির ব্যস্ততা কোনো কিছুই তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। বর্তমানে তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।


দুর্গম চরাঞ্চলে দায়িত্ব পালন, দীর্ঘ যাতায়াত, বিদ্যুৎবিহীন পরিবেশ সব প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন। কখনো মোমবাতির আলোয়, কখনো লাইব্রেরির নির্জন কোণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন। তাঁর এই সংগ্রামের গল্প আজ হাজারো চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। প্রাথমিক শিক্ষা শিলিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেষ করে তিনি ভর্তি হন বসুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে রাজশাহী মেডিকেল ক্যাম্পাস হাই স্কুল এবং সরকারি সিটি কলেজে পড়াশোনা করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন দেশের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রাজশাহী কলেজের রসায়ন বিভাগে। সেখান থেকেই অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। আব্দুল মতিন বলেন, অনেকে মনে করেন শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই সফল হওয়া যায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ মানুষকে যেখানে রাখেন, সেখানেই ভালো কিছু করার সুযোগ করে দেন। রাজশাহী কলেজ আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। এখানকার শিক্ষকদের আন্তরিকতা, দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণাই আমাকে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। ২০১৯ সালের শেষ দিকে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করলেও ২০২২ সাল থেকে তিনি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তাঁর বিসিএস যাত্রা ছিল কঠিন। ৪৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়েন। ৪৫তম বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত গিয়েও চূড়ান্ত সুপারিশ পাননি।

বিশেষ বিসিএসেও সফল হতে পারেননি। এরপর ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসে অংশ নিয়ে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তিনি বলেন, ৪৫তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হয়েছিল, হয়তো আমার দ্বারা আর হবে না। কিন্তু পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু এবং আল্লাহর ওপর ভরসাই আমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। চাকরির পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।


তিনি বলেন, আমার কর্মস্থল ছিল দুর্গম চরাঞ্চলে। যাতায়াতে অনেক সময় নষ্ট হতো। অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকত না। তখন মোমবাতির আলোয় পড়েছি। বাসায় বসে দীর্ঘ সময় পড়ার অভ্যাস ছিল না। সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তাম। ফল প্রকাশের দিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে আসরের নামাজে যান তিনি। তিনি বলেন, নামাজে যাওয়ার আগে বড় ভাইকে বলেছিলাম, ফল বের হলে যেন জানায়। নামাজ শেষে ফিরে শুনি আমি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। খবরটি শুনে পরিবারের সবাই আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন। জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল সেটি।

আব্দুল মতিনের ভাষায়, তাঁর সফলতার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর পরিবার। তিনি বলেন, বাবা বছরের পর বছর সাইকেলে করে আমাকে কোচিংয়ে নিয়ে গেছেন। মা সবসময় দোয়া ও সাহস দিয়েছেন। শিক্ষক, বন্ধু, স্ত্রী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যরাও সবসময় পাশে ছিলেন। এই অর্জন তাঁদের সবার। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে মানুষের সেবা করাই তাঁর মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, চরাঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুধু সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। চাকরিপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সময়কে মূল্য দিতে হবে, মোবাইল ফোনকে শেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে এবং শুধু মুখস্থ নয়, বিষয়গুলো বুঝে পড়তে হবে। তাঁর মতে, সফলতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো ধৈর্য ও পরিশ্রম।


তিনি বলেন, পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আজ না হোক, কাল আল্লাহ তাআলা অবশ্যই পরিশ্রমের প্রতিদান দেবেন। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, পরিবারকে মূল্য দিন এবং কখনো হাল ছেড়ে দেবেন না। মো. আব্দুল মতিনের গল্প কেবল একজন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার গল্প নয়; এটি রাজশাহী কলেজের একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। একের পর এক ব্যর্থতা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতাই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা, নিজের নিরলস পরিশ্রম এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস এই চারটি শক্তির সমন্বয়েই তিনি আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন। মো. আব্দুল মতিনের অর্জনকে রাজশাহী কলেজের গর্ব বলে উল্লেখ করেছেন কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ইব্রাহিম আলী। তিনি বলেন, মো. আব্দুল মতিনের এই অর্জন রাজশাহী কলেজ পরিবারের জন্য অত্যন্ত গর্বের।

তিনি প্রমাণ করেছেন, সাফল্য অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠান নয়, প্রয়োজন লক্ষ্য, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম। রাজশাহী কলেজ সবসময় শিক্ষার্থীদের মানবিক, নৈতিক ও একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের পরিবেশ তৈরি করে। মতিনের এই সাফল্য বর্তমান শিক্ষার্থীদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর জন্য আমাদের আন্তরিক শুভকামনা রইল।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]