নিজস্ব প্রতিবেদক :
মহানবীর (সা.) মুচকি হাসি আমাদের যে শিক্ষা দেয় ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, বরং মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, এমনকি ঘুমানোর সঠিক পদ্ধতি কী— সবই শিখিয়েছে ইসলাম। কারও কাছে মনে হতে পারে, ২৪ ঘণ্টা নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থাকা বোধহয় বেশ কঠিন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসলাম এতটাই সহজাত ও বাস্তবসম্মত এক জীবনপদ্ধতি যে, এর নিয়মগুলো মেনে চলা মানুষের জন্য নিশ্বাসের মতোই সহজ। নিশ্বাসের মতোই সহজ ও স্বাভাবিক আরেকটি বিষয় হলো মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলা। ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু বাঁকা রেখা আর চোখের কোণের মৃদু সংকোচন কেবল আপনার নিজের মনকেই ভালো করে না, বরং আপনার চারপাশের মানুষের বুকেও আনন্দের দোলা দিয়ে যায়।
একটি মিষ্টি হাসি মানুষের মনের সব ক্লান্তি দূর করে আত্মাকে সতেজ করে তোলে। মহানবী (সা.)-এর চিরচেনা হাসি আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রায়শই হাসতেন এবং সেই হাসিতে থাকত এক জান্নাতি আনন্দ। তিনি নিয়মিত এতো বেশি হাসিমুখে থাকতেন যে, ইসলামের বিভিন্ন ইতিহাস ও হাদিসের পাতায় পাতায় তার সেই চিরচেনা হাসি এবং কোমল আচরণের কথা বারবার উঠে এসেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি আর কাউকে আমি হাসিমুখে থাকতে দেখিনি। মহানবী (সা.) তার কোনো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে কথা বলাকেও সদকা বা দান হিসেবে গণ্য করতেন।’ (তিরমিজি, ৩৬৪১) হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে তার কাছে আসার অনুমতি দিতে কখনো অস্বীকৃতি জানাননি। আর যখনই তিনি আমার দিকে তাকাতেন, তার পবিত্র মুখে একটি মিষ্টি হাসি ফুটে উঠত।’ (মুসলিম, ৬০৫০) মহানবী (সা.)-এর এক সাহাবিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কখনো আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে বসতেন কি না।
জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, প্রায়ই বসতাম। আল্লাহর রাসূল (সা.) ফজরের নামাজ আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত তার জায়নামাজেই বসে থাকতেন। এরপর তিনি যখন দাঁড়াতেন, তখন সাহাবিরা জাহেলি যুগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলতেন এবং হাসাহাসি করতেন। আর আল্লাহর রাসূল (সা.) শুধু মৃদু হাসতেন।’ (মুসলিম, ১৪১১) গুনাহ মাফের যে হাদিস বলার সময় মুচকি হেসেছিলেন মহানবী (সা.) মুচকি হেসে কথা বললে যে সওয়াব পাবেন মহানবীর হাসি যেমন ছিল হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। একদিন তিনি আমাকে একটি প্রয়োজনে বাইরে পাঠালেন।
তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি যাব না। কিন্তু আমার বিবেক আমাকে বলছিল, আল্লাহর রাসূল যেহেতু নির্দেশ দিয়েছেন, তাই আমার যাওয়া উচিত। এরপর আমি যখন বের হলাম, তখন রাস্তায় কিছু ছেলেকে খেলাধুলা করতে দেখলাম। হঠাৎ আল্লাহর রাসূল (সা.) পেছন থেকে এসে আমার ঘাড়ের পেছনের অংশ আলতো করে চেপে ধরলেন। আমি যখন তার দিকে তাকালাম, দেখলাম তিনি পরম স্নেহে হাসছেন।’ (আবু দাউদ, ৪৭৫৫) মহানবী (সা.) স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তার প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.) তার চরিত্র সম্পর্কে বলেছেন, মহানবীর চরিত্র ছিল স্বয়ং পবিত্র কোরআন। এর অর্থ হলো, মহানবী (সা.) তার পুরো জীবন কোরআনের আলোকেই সাজিয়েছিলেন। আমাদের জীবনে অনুসরণের জন্য তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণই সর্বোত্তম আদর্শ। আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে ১০ বছরেরও বেশি সময় কাটানো এক সাহাবি বলেছেন, ‘তার সঙ্গে থাকার পুরো সময়ে আমি কখনো তার মুখ থেকে কোনো অশোভন শব্দ শুনিনি এবং তিনি কারও সঙ্গে কখনো রুঢ় আচরণ করেননি। তিনি সবসময় অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা বলতেন এবং সবার প্রতি দয়ালু ছিলেন।’ চারপাশের মানুষের সঙ্গে মন খুলে হাসা এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ছিল মহানবীর সহজাত বৈশিষ্ট্য। হাসির ইতিবাচক প্রভাব মহানবী (সা.) হাসি মুখে থাকতেন, তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হাসি মুখে থাকা আমাদের এবং আমাদের চারপাশের সবার জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর একটি বিষয়। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে একটি নিখুঁত জীবনবিধান হিসেবে তৈরি করেছেন। আর তাই ইসলামের ছোট ছোট বিষয়েরও রয়েছে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব। হাসি তেমনই একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
স্বাভাবিকভাবেই হাসির রয়েছে চমৎকার কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা। বর্তমান বিজ্ঞান বলছে, হাসি মানুষের শরীরকে শিথিল বা রিল্যাক্স করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে সব সংস্কৃতিতেই হাসিকে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হাসি মানুষের ভেতরের আনন্দকে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রাকৃতিক উপায়। হাসলে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক থাকে এবং সাময়িকভাবে রক্তচাপ কমে আসে। হাসির মাধ্যমে শরীরে এন্ডোরফিন নামক হরমোন নিঃসৃত করে মানসিক চাপ কমায়, যা পরোক্ষভাবে মানুষের মনকে ভালো করে তোলে। এমনকি এন্ডোরফিন হরমোন শরীরের ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও তাই হাসি এবং কৌতুককে নিরাময়ের অন্যতম সহায়ক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাস্থ্যগত দিক থেকে চিন্তা করলে, হাসি শরীরকে শান্ত রাখার মাধ্যমে রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও সক্রিয় করে তোলে, ফলে শরীর যেকোনো রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকরভাবে লড়াই করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে হাসিখুশি থাকলে কাজের উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে। এটি মানুষকে দীর্ঘকাল তরুণ রাখতে সাহায্য করে। অন্তত একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত হাসার অভ্যাস মানুষের গড় আয়ু প্রায় সাত বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, হাসি হলো সংক্রামক। অর্থাৎ আপনি যখন হাসবেন, তখন আপনার দেখাদেখি অন্যরাও হাসবে। ফলে নিজের অজান্তেই আপনি চারপাশের মানুষের মাঝে এক ধরনের ইতিবাচক শক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। মহানবী (সা.)-এর উদারতা ও দানশীলতার কথা সর্বজনবিদিত। আর তার এই মহানুভবতার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল চারপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসা। বৈজ্ঞানিক গবেষণার বহু আগেই সাহাবিরা প্রিয় নবীকে অন্ধের মতো অনুকরণ করতেন, কারণ তারা জানতেন যে আল্লাহর রাসূলের প্রতিটি কাজই স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত।
হাসির বৈজ্ঞানিক উপকারিতা হয়তো তারা তখন জানতেন না, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে প্রিয় নবীর একেকটি মিষ্টি হাসি তাদের মনকে এক অপার্থিব সুখে ভরিয়ে দিত এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রফুল্ল রাখত। মহানবী (সা.) সবসময় গরিব ও দুস্থদের পাশে দাঁড়াতেন। অসুস্থ মানুষের খোঁজ নিতে তাদের বাড়ি বাড়ি যেতেন। আর রাস্তায় চলার পথে যার সঙ্গেই তার দেখা হতো,
সুন্দর একটি হাসিমুখে তিনি বলতেন,
আসসালামু আলাইকুম। তবে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখুলে হাসার আগে আমাদের একটি ছোট্ট বিষয় মনে রাখা জরুরি। ইসলাম হলো মধ্যপন্থার ধর্ম। মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের প্রতিটি কাজেই সংযম ও পরিমিতিবোধ থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই সারাক্ষণ কেবল অনর্থক হাসাহাসি বা কৌতুক করে কাটানো মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে, মহানবী (সা.) তার পরিবার ও সাহাবিদের সঙ্গে আনন্দ-কৌতুক করতেন এবং তাদের ভালোবাসার সুন্দর সুন্দর ডাকনামও দিতেন, কিন্তু তার প্রতিটি রসিকতার পেছনে থাকত উচ্চ নৈতিক আদর্শ ও শালীনতা। তিনি কখনো কাউকে কষ্ট দিয়ে কিংবা মিথ্যা বলে কৌতুক করতেন না।
এ প্রসঙ্গে তিনি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলে এবং মিথ্যা আশ্রয় নেয়। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।
(তিরমিজি, ২৩১৫) তাই আসুন, রাসুল (সা.)-এর এই সুন্দর সুন্নতকে ধারণ করি। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় নিজের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে রাখি। কারণ এই হাসির মূল্য আপনার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।
মহানবীর (সা.) মুচকি হাসি আমাদের যে শিক্ষা দেয় ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, বরং মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, এমনকি ঘুমানোর সঠিক পদ্ধতি কী— সবই শিখিয়েছে ইসলাম। কারও কাছে মনে হতে পারে, ২৪ ঘণ্টা নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থাকা বোধহয় বেশ কঠিন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসলাম এতটাই সহজাত ও বাস্তবসম্মত এক জীবনপদ্ধতি যে, এর নিয়মগুলো মেনে চলা মানুষের জন্য নিশ্বাসের মতোই সহজ। নিশ্বাসের মতোই সহজ ও স্বাভাবিক আরেকটি বিষয় হলো মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলা। ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু বাঁকা রেখা আর চোখের কোণের মৃদু সংকোচন কেবল আপনার নিজের মনকেই ভালো করে না, বরং আপনার চারপাশের মানুষের বুকেও আনন্দের দোলা দিয়ে যায়।
একটি মিষ্টি হাসি মানুষের মনের সব ক্লান্তি দূর করে আত্মাকে সতেজ করে তোলে। মহানবী (সা.)-এর চিরচেনা হাসি আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রায়শই হাসতেন এবং সেই হাসিতে থাকত এক জান্নাতি আনন্দ। তিনি নিয়মিত এতো বেশি হাসিমুখে থাকতেন যে, ইসলামের বিভিন্ন ইতিহাস ও হাদিসের পাতায় পাতায় তার সেই চিরচেনা হাসি এবং কোমল আচরণের কথা বারবার উঠে এসেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি আর কাউকে আমি হাসিমুখে থাকতে দেখিনি। মহানবী (সা.) তার কোনো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে কথা বলাকেও সদকা বা দান হিসেবে গণ্য করতেন।’ (তিরমিজি, ৩৬৪১) হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে তার কাছে আসার অনুমতি দিতে কখনো অস্বীকৃতি জানাননি। আর যখনই তিনি আমার দিকে তাকাতেন, তার পবিত্র মুখে একটি মিষ্টি হাসি ফুটে উঠত।’ (মুসলিম, ৬০৫০) মহানবী (সা.)-এর এক সাহাবিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কখনো আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে বসতেন কি না।
জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, প্রায়ই বসতাম। আল্লাহর রাসূল (সা.) ফজরের নামাজ আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত তার জায়নামাজেই বসে থাকতেন। এরপর তিনি যখন দাঁড়াতেন, তখন সাহাবিরা জাহেলি যুগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলতেন এবং হাসাহাসি করতেন। আর আল্লাহর রাসূল (সা.) শুধু মৃদু হাসতেন।’ (মুসলিম, ১৪১১) গুনাহ মাফের যে হাদিস বলার সময় মুচকি হেসেছিলেন মহানবী (সা.) মুচকি হেসে কথা বললে যে সওয়াব পাবেন মহানবীর হাসি যেমন ছিল হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। একদিন তিনি আমাকে একটি প্রয়োজনে বাইরে পাঠালেন।
তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি যাব না। কিন্তু আমার বিবেক আমাকে বলছিল, আল্লাহর রাসূল যেহেতু নির্দেশ দিয়েছেন, তাই আমার যাওয়া উচিত। এরপর আমি যখন বের হলাম, তখন রাস্তায় কিছু ছেলেকে খেলাধুলা করতে দেখলাম। হঠাৎ আল্লাহর রাসূল (সা.) পেছন থেকে এসে আমার ঘাড়ের পেছনের অংশ আলতো করে চেপে ধরলেন। আমি যখন তার দিকে তাকালাম, দেখলাম তিনি পরম স্নেহে হাসছেন।’ (আবু দাউদ, ৪৭৫৫) মহানবী (সা.) স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তার প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.) তার চরিত্র সম্পর্কে বলেছেন, মহানবীর চরিত্র ছিল স্বয়ং পবিত্র কোরআন। এর অর্থ হলো, মহানবী (সা.) তার পুরো জীবন কোরআনের আলোকেই সাজিয়েছিলেন। আমাদের জীবনে অনুসরণের জন্য তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণই সর্বোত্তম আদর্শ। আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে ১০ বছরেরও বেশি সময় কাটানো এক সাহাবি বলেছেন, ‘তার সঙ্গে থাকার পুরো সময়ে আমি কখনো তার মুখ থেকে কোনো অশোভন শব্দ শুনিনি এবং তিনি কারও সঙ্গে কখনো রুঢ় আচরণ করেননি। তিনি সবসময় অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা বলতেন এবং সবার প্রতি দয়ালু ছিলেন।’ চারপাশের মানুষের সঙ্গে মন খুলে হাসা এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ছিল মহানবীর সহজাত বৈশিষ্ট্য। হাসির ইতিবাচক প্রভাব মহানবী (সা.) হাসি মুখে থাকতেন, তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হাসি মুখে থাকা আমাদের এবং আমাদের চারপাশের সবার জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর একটি বিষয়। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে একটি নিখুঁত জীবনবিধান হিসেবে তৈরি করেছেন। আর তাই ইসলামের ছোট ছোট বিষয়েরও রয়েছে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব। হাসি তেমনই একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
স্বাভাবিকভাবেই হাসির রয়েছে চমৎকার কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা। বর্তমান বিজ্ঞান বলছে, হাসি মানুষের শরীরকে শিথিল বা রিল্যাক্স করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে সব সংস্কৃতিতেই হাসিকে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হাসি মানুষের ভেতরের আনন্দকে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রাকৃতিক উপায়। হাসলে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক থাকে এবং সাময়িকভাবে রক্তচাপ কমে আসে। হাসির মাধ্যমে শরীরে এন্ডোরফিন নামক হরমোন নিঃসৃত করে মানসিক চাপ কমায়, যা পরোক্ষভাবে মানুষের মনকে ভালো করে তোলে। এমনকি এন্ডোরফিন হরমোন শরীরের ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও তাই হাসি এবং কৌতুককে নিরাময়ের অন্যতম সহায়ক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাস্থ্যগত দিক থেকে চিন্তা করলে, হাসি শরীরকে শান্ত রাখার মাধ্যমে রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও সক্রিয় করে তোলে, ফলে শরীর যেকোনো রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকরভাবে লড়াই করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে হাসিখুশি থাকলে কাজের উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে। এটি মানুষকে দীর্ঘকাল তরুণ রাখতে সাহায্য করে। অন্তত একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত হাসার অভ্যাস মানুষের গড় আয়ু প্রায় সাত বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, হাসি হলো সংক্রামক। অর্থাৎ আপনি যখন হাসবেন, তখন আপনার দেখাদেখি অন্যরাও হাসবে। ফলে নিজের অজান্তেই আপনি চারপাশের মানুষের মাঝে এক ধরনের ইতিবাচক শক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। মহানবী (সা.)-এর উদারতা ও দানশীলতার কথা সর্বজনবিদিত। আর তার এই মহানুভবতার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল চারপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসা। বৈজ্ঞানিক গবেষণার বহু আগেই সাহাবিরা প্রিয় নবীকে অন্ধের মতো অনুকরণ করতেন, কারণ তারা জানতেন যে আল্লাহর রাসূলের প্রতিটি কাজই স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত।
হাসির বৈজ্ঞানিক উপকারিতা হয়তো তারা তখন জানতেন না, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে প্রিয় নবীর একেকটি মিষ্টি হাসি তাদের মনকে এক অপার্থিব সুখে ভরিয়ে দিত এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রফুল্ল রাখত। মহানবী (সা.) সবসময় গরিব ও দুস্থদের পাশে দাঁড়াতেন। অসুস্থ মানুষের খোঁজ নিতে তাদের বাড়ি বাড়ি যেতেন। আর রাস্তায় চলার পথে যার সঙ্গেই তার দেখা হতো,
সুন্দর একটি হাসিমুখে তিনি বলতেন,
আসসালামু আলাইকুম। তবে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখুলে হাসার আগে আমাদের একটি ছোট্ট বিষয় মনে রাখা জরুরি। ইসলাম হলো মধ্যপন্থার ধর্ম। মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের প্রতিটি কাজেই সংযম ও পরিমিতিবোধ থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই সারাক্ষণ কেবল অনর্থক হাসাহাসি বা কৌতুক করে কাটানো মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে, মহানবী (সা.) তার পরিবার ও সাহাবিদের সঙ্গে আনন্দ-কৌতুক করতেন এবং তাদের ভালোবাসার সুন্দর সুন্দর ডাকনামও দিতেন, কিন্তু তার প্রতিটি রসিকতার পেছনে থাকত উচ্চ নৈতিক আদর্শ ও শালীনতা। তিনি কখনো কাউকে কষ্ট দিয়ে কিংবা মিথ্যা বলে কৌতুক করতেন না।
এ প্রসঙ্গে তিনি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলে এবং মিথ্যা আশ্রয় নেয়। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।
(তিরমিজি, ২৩১৫) তাই আসুন, রাসুল (সা.)-এর এই সুন্দর সুন্নতকে ধারণ করি। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় নিজের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে রাখি। কারণ এই হাসির মূল্য আপনার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।