বাজার নয়, ভরসা নিজের ছাদ: সবুজ স্বপ্নে স্বনির্ভর এক পরিবারের গল্প

আপলোড সময় : ০৯-০৬-২০২৬ ১০:২৯:৫২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৯-০৬-২০২৬ ১০:২৯:৫২ অপরাহ্ন

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি 

গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি বাড়ির ছাদ প্রতিদিন নীরবে বদলে দেয় পরিচিত এক দৃশ্যপট। চারপাশে ইট, বালু আর কংক্রিটের দেয়াল। তার মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাউয়ের মাচা, শিমের লতা আর সবজির সারি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো গ্রামের উঠান ভুল করে উঠে এসেছে শহরের একটি ছাদে।

এই ছাদের মালিক ত্রিশোর্ধ মো. নাজমুল হোসেন। তবে তার কাছে এটি কেবল শখের বাগান নয়; এটি পরিবারের নিরাপদ খাদ্যের উৎস, অবসরের সঙ্গী এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার এক অনন্য মাধ্যম।

একতলা বাড়ির ছাদে পা রাখলেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। কোথাও ঝুলছে লাউ, কোথাও দুলছে শিমের লতা। টবে টবে বেড়ে উঠছে ঢেঁড়স, বেগুন, টমেটো, করলা, বরবটি, কলমি শাক, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙা ও কাঁচা মরিচ। ফলের গাছের মধ্যে রয়েছে ড্রাগন, পেয়ারা, ডালিম, মালবেরি, পেঁপে ও ফিলিপাইন আখ।

দুই বছর আগে নিছক আগ্রহ থেকে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। তখন কয়েকটি টব আর কিছু চারা গাছ ছিল তার সম্বল। ধীরে ধীরে সেই ছোট উদ্যোগই আজ রূপ নিয়েছে একটি পরিপূর্ণ ছাদ বাগানে।

বর্তমান সময়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভেজাল ও রাসায়নিক ব্যবহারের নানা শঙ্কার মধ্যে নাজমুলের এই বাগান যেন এক স্বস্তির নাম। পরিবারের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় অনেক সবজিই এখন আসে নিজের ছাদ থেকে। ফলে বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কমেছে।

নাজমুল হোসেন বলেন, “ছাদের সবজির স্বাদ আলাদা। কারণ এগুলো সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদন করি। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত সবজি প্রতিবেশীদেরও দিই।”

চাষাবাদের শুরুতে অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নিলেও এখন তিনি নিয়মিত কৃষিবিষয়ক ভিডিও, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ থেকে নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করেন।

তার বাগানের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো জৈব সার ব্যবহার। রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, শুকনো পাতা ও ভার্মি কম্পোস্ট থেকে তৈরি সারই গাছের প্রধান পুষ্টির উৎস। ফলে উৎপাদিত ফসল থাকে বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত।

এই সবুজ উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন তার সহধর্মিণী লিমা আক্তারও। গাছের পরিচর্যা থেকে শুরু করে টব স্থানান্তর কিংবা মাটি প্রস্তুত-সব ক্ষেত্রেই তিনি সহযোগিতা করেন।

লিমা আক্তার বলেন, “প্রতিদিন অন্তত একবার ছাদে না এলে ভালো লাগে না। নতুন ফুল বা ফল দেখলে মনে হয় পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।”

বড় পরিবারের মিলনস্থল হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছে এই ছাদ। বাবা-মা, সন্তান, ছোট ভাই ও তার পরিবার-সবারই অবসর কাটানোর প্রিয় জায়গা এটি। অনেক সময় সন্ধ্যার আড্ডাও বসে গাছপালার মাঝখানে।

শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, আশপাশের মানুষও নিয়মিত এই বাগান দেখতে আসেন। কেউ পরামর্শ নেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ বাড়িতেও ছাদ বাগান শুরু করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী বলেন, “ছাদ বাগান শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়, এটি পরিবেশ সুরক্ষারও একটি কার্যকর উদ্যোগ। গাছপালা কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং নগর এলাকায় সবুজের পরিমাণ বাড়ায়।”

দ্রুত নগরায়নের এই সময়ে নাজমুল ও লিমার ছাদ বাগান যেন একটি নীরব বার্তা বহন করছে-সবুজের জন্য বড় জমির প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু আগ্রহ ও যত্ন। আর সেই যত্নেই একটি সাধারণ ছাদ পরিণত হতে পারে নিরাপদ খাদ্য, পারিবারিক বন্ধন ও পরিবেশ সচেতনতার এক অনন্য ঠিকানায়।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]