হিটলারের মৃত্যু ঘিরে যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও

আপলোড সময় : ৩০-০৪-২০২৬ ০৫:২৪:১০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৪-২০২৬ ০৫:২৪:১০ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিবিসি রেডিওর সংবাদ পাঠক স্টুয়ার্ট হিবার্ড ১৯৪৫ সালের পহেলা মে যখন হিটলারের মৃত্যুর খবরটি পড়ছিলেন, তখন লন্ডনে রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। ‘দ্য জার্মান রেডিও হ্যাজ জাস্ট অ্যানাউন্সড দ্যাট হিটলার ইজ ডেড’- পড়ছিলেন তিনি। অর্থাৎ, জার্মান রেডিও ওই সময়ই ঘোষণা দেয় হিটলার মারা গেছেন। এরপর এক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে ‘আই রিপিট’ বলে তিনি একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি করেন।

ওইদিন জার্মান রেডিওর এই ঘোষণা প্রথম ইংরেজিতে সম্প্রচার করে বিবিসি। জার্মান রেডিওর ঘোষণায় হিটলারের মৃত্যুর খবরের সাথে বলা হয়, হিটলার জার্মানির হয়ে বলশেভিকদের সাথে লড়াই করতে করতে মারা গেছেন।

হিটলার আর জীবিত নেই- এ খবর তখন পাওয়া গেলেও তার অনেক পরে জানা যায় তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

হিটলারের শেষ সময় তার সাথে বাংকারে অবস্থান করা তার সহচরদের সাক্ষাৎকার আর হিটলারকে নিয়ে হওয়া বহু গবেষণার ভিত্তিতে তার আত্মহত্যার বিষয়টিকে ঐতিহাসিকভাবে সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তার লাশ কোথায় এবং তা নিয়ে কী করা হয়েছে, সে বিষয়ে আজও মতভেদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

হিটলারের মৃত্যুর ৪৮ বছর পর, ১৯৯৩ সালে প্রথমবার রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়, তার লাশ তাদের কাছে রয়েছে। তারও ৭ বছর পর ২০০০ সালে মস্কোতে এক প্রদর্শনীতে হিটলারের মাথার খুলির একাংশ দেখানোর দাবি করা হয়।

তবে জার্মান ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক ও হিটলার বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত ওয়ার্নার মেইসার সবসময়ই এই দাবিকে 'ভুয়া' হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন।

১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হওয়া হিটলারের ডায়রি'র বিষয়বস্তুকেও 'জাল' দাবি করা প্রথম বিশেষজ্ঞ ছিলেন মেইসার। পরে হিটলারের ডায়েরি ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হয়।

হিটলারের অন্তিম সময় নিয়ে যা জানা যায়

ইউরোপে যুদ্ধ যখন শেষদিকে, সোভিয়েত বাহিনী জার্মানির রাজধানী বার্লিনে প্রায় ঢুকে পড়েছে, তখন হিটলার তার কাছের লোকদের নিয়ে বার্লিনে একটি বাংকারে আশ্রয় নেন। ওই বাংকারে হিটলারের সাথে ছিলেন তার সেক্রেটারি ট্রাউডল ইয়ুঙ্গে।

ইয়ুঙ্গে ১৯৪৩ সালে ২২ বছর বয়সে জার্মান চ্যান্সেলারিতে টাইপিস্ট হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকেই হিটলারের সেক্রেটারি হিসেবে কাজের সুযোগ আসে তার।

‘আমি তখন ২২ বছর বয়সী এক তরুণী। আমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজছিলাম।আমার বোন তখন বার্লিনে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করছিল। আমি তখন রাইখস চ্যান্সেলারিতে সেক্রেটারি হিসেবে টাইপিস্টের চাকরির সুযোগ পাই এবং তা গ্রহণ করি’, ১৯৮৯ সালে বিবিসির জিনা রোহানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এভাবে হিটলারের হয়ে কাজ শুরুর ঘটনাটি বলছিলের ট্রাউডল ইয়ুঙ্গে।

ইয়ুঙ্গের কাজ ছিল মূলত হিটলারের ব্যক্তিগত চিঠি পড়া ও হিটলারের হয়ে সেগুলোর জবাব দেওয়া। এমনকি জার্মান তরুণীদের কাছ থেকে হিটলারের কাছে যেসব প্রেমপত্র আসতো, সেগুলোর জবাব দেওয়ার দায়িত্বও ছিল ইয়ুঙ্গের।

ট্রাউডল ইয়ুঙ্গে বলেন, ‘আমার একটি দায়িত্ব ছিল, আমাদের বলা হয়েছিল হিটলারকে চিঠি পড়ে শোনাতে এবং তার উত্তর লিখতে। যেসব মেয়েরা রাজনীতিতে আগ্রহী নয়, সেই মেয়েদের সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে তিনি যেন রিল্যাক্স করতে পারেন ‘

ট্রাউডল ইয়ুঙ্গের সাক্ষাৎকার ও হিটলারের শেষ সময় নিয়ে লেখা তার বই 'আনটিল দ্য ফাইনাল আওয়ার' এর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে হিটলারের শেষ সময় নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তৈরি করা হয়েছে একাধিক প্রামাণ্যচিত্র।

জিনা রোহানকে ১৯৭৯ সালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাউডল ইয়ুঙ্গে বলেন, ‘বাংকারে থাকার সময় হিটলার বেশ কয়েকদিন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আত্মহত্যা করার। তার সাথে শেষ সময় বাংকারে থাকা তার সহচররাও হিটলারের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতেন। তিনি এটি পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি যদি বার্লিনে বিজয়ী না হন, তাহলে তিনি পালাবেন না। তিনি বার্লিনেই থাকবেন এবং আত্মহত্যা করবেন।’

কিন্তু ২২ এপ্রিল ১৯৪৫ এ তিনি যখন আমাদের বললেন, ‘আমরা চাইলে বার্লিন ছাড়তে পারি এবং আমাদের বার্লিন ছাড়া উচিত, তখন ইভা ব্রাউন প্রথমে বলেন যে-'না, তুমি জানো আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাবো না। আমি থাকবো'।

২৭ এপ্রিলের মধ্যে বার্লিন পুরোপুরি রাশিয়ান বাহিনীর দখলে চলে যায়। ওই সময় হিটলার মেনে নেন যে তার পরাজয় নিশ্চিত। তখন তিনি ইভা ব্রাউনকে বিয়ে করেন। তার শেষ উইল ঘোষণা করেন ট্রাউডল ইয়ুঙ্গের সামনে এবং নিজেকে হত্যার প্রস্তুতি নেন।

‘সবাই অপেক্ষা করছিল হিটলার আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু তার আগে তার বিয়ে করতে হতো এবং নিজের শেষ উইল ঘোষণা করতে হতো। আর সেটি ছিল এপ্রিলের ২৮ তারিখ। হিটলার ও তার সাথে ১১ বছর ধরে সম্পর্কে থাকা ইভা ব্রাউন বিয়ে করেন ২৮ এপ্রিল মধ্যরাতের পর, অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল।’

হিটলারের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে যা জানা যায়

ধারণা করা হয় হিটলার শুরুতে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল নেন, পরে নিজেকে গুলি করেন। ইভা ব্রাউনও সায়ানাইড খেয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

হিটলারে সাথে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকা দেহরক্ষী রখুস মিশ এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল, হিটলারের মারা যাওয়ার সময় কী হয়েছিল। হিটলার যে বাংকারে ছিলেন, সেখানে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। ২০০৯ সালে বিবিসির স্টিভ রোজেনবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ৩০ এপ্রিলের স্মৃতিচারণ করেন।

‘৩০ এপ্রিল সকালে বাংকার ভেতরে হিটলারের সেক্রেটারিকে কেউ চিৎকার করে বলে যে সে গুলির শব্দ শুনেছে। সে সেক্রেটারিকে বলে যে ঘটনাটি সম্ভবত ঘটে গেছে। ওই সময় হিটলারের একান্ত ব্যক্তিগত সেক্রেটারি মার্টিন ব্রম্যান বাংকারের সবাইকে উদ্দেশ করে বলেন সবাই যেন আস্তে কথা বলে। এরপর হিটলারের ঘরের দরজা খোলার নির্দেশ দেন ব্রম্যান।’

‘হিটলারের একজন সহচর পরপর দুটি দরজা খোলেন। আমি কৌতুহলবশত এগিয়ে যাই, দেখতে পাই হিটলার টেবিলে মাথা রেখে শুয়ে আছেন।’

‘ইভা ব্রাউন হিটলারে দিকে দৃষ্টি দিয়ে পাশে সোফায় শুয়ে আছেন। তার হাঁটু ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখা ছিল। তিনি গাঢ় নীল রঙয়ের একটি পোশাক পরে ছিলেন’, সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন রখুস মিশ।

তিনি জানান, দুজনের লাশ বের করে নিয়ে আসতে দেখেন তিনি। রখুস বলছিলেন যে হিটলারের সহচর গুনশেন লিঙ্গার আরো দু’জনকে সাথে নিয়ে তাদের লাশ বের করে নিয়ে আসেন। তাদের লাশ বাংকারের বাইরে নেওয়া হয়।

তখন রখুসকে বাংকারের একজন এসে বলেন, ‘ওপরে চলো, তারা বস-এর লাশ পুড়িয়ে ফেলতে চাচ্ছে’।

রখুস মিশ তখন বলেন, ‘আমি দেখতে চাই না, আমি এখান থেকে বের হতে চাই।’

তিনি তখন এমনো সন্দেহ করেছিলেন এই ঘটনার সাক্ষী হওয়ায় তাদের হত্যা করা হবে।

১৯৪৫ সালের মে মাসের ৭ তারিখ রাশান আর্মির সদস্যরা বাংকারে উপস্থিত হওয়ার আগে দিয়ে রখুস মিশ ও ট্রাউডল ইয়ুঙ্গে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন।

ট্রাউডল ইয়ুঙ্গের মতে, হিটলারের সাথে সবসময়ই তার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর থাকলেও, তিনি তাদের কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না।

‘আমার মনে হয় তার ভালো বন্ধু বা কাছের বন্ধু ছিল না। তিনি সবসময় বলতেন, আমার বন্ধু হলো ইভা ব্রাউন আর আমার কুকুর। এই দুটি প্রাণীকেই শুধু সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারি আমি।’

আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নিজের শেষ সময়গুলোতেও হিটলার কাউকে বিশ্বাস করতেন না।

‘হিটলারের কুকুর তার আগে মারা যায়, কারণ হিটলারের আগে কুকুরটিকে পরীক্ষামূলকভাবে সায়ানাইড ক্যাপসুল দেওয়া হয়। কারণ সায়ানাইড ক্যাপসুল দেওয়া ব্যক্তিকে তিনি অবিশ্বাস করতেন। ইভা ব্রাউনকেও নেই ক্যাপসুল দেওয়া হয়। সেটির প্রভাব তিনি পরীক্ষা করেন ব্লন্ডির (হিটলারের কুকুর) ওপর, হিটলারের মৃত্যুর আগেই সে মারা যায়।’

হিটলারের লাশ সম্পর্কে যা জানা যায়

১৯৪৫ সালের ৭ মে রাশান আর্মির কাছে জার্মান বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করারও কয়েকদিন পর হিউ লাংহি নামের একজন বৃটিশ আর্মি অফিসার হিটলারের ওই বাংকারে প্রবেশের সুযোগ পান।

ধারণা করা হয়, তিনিই প্রথম নন রাশিয়ান, যিনি ওই বাংকারে ঢুকতে পেরেছিলেন।

‘আমি জানতাম এটা হিটলারের বাংকার। কিন্তু হিটলারের লাশ কোথায় বা তার ঘর কোনটা ছিল, আমি তখন জানতাম না। সেখান থেকে যখন বের হই, আমি ছাই-ভস্মের একটি স্তূপ দেখতে পাই।’

‘আমার ধারণা বাংকারে ঢোকার রাস্তার ১০ গজ দূরে। আমি একজন গার্ডকে জিজ্ঞেস করি, ওখানে কী বই পুড়িয়েছো? সে বলে, না, ওটা হিটলার।’

তবে ওই স্তূপে আসলেই হিটলারের লাশ ছিল কি না তা নিশ্চিত করতে পারেননি হিউ লাংহি। রাশানরাও কখনোই খোলাসা করে জানায়নি ওই স্তূপে তারা কী পেয়েছিল।

রাশিয়ানরা হিটলারের লাশ কোথায় রয়েছে তা জানাতে চায়নি কারণ, তাদের আশঙ্কা ছিল পরবর্তীতে কোনো এক সময়ে সেই লাশকে কেন্দ্র করে আবারো জার্মানিতে বা ইউরোপে হিটলারের দর্শন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হতে পারে।

হিটলারের লাশ নিয়ে কী করা হয়েছিল তা নিয়ে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। যার মধ্যে একটি হলো তার ও ইভা ব্রাউনের লাশ বাংকারের বাইরে পুড়িয়ে মাটি চাপা দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে রাশিয়ান বাহিনী অধ্যুষিত পূর্ব জার্মানির একটি অঞ্চলে মাটির নিচে চাপা দেওয়া ছিল।

সত্তরের দশকে রুশ শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সেই লাশ উত্তোলন করে আবারো পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে পরে বিভিন্ন গোয়েন্দা নথিতে উঠে আসে। তবে এই তথ্য কখনোই শতভাগ নিশ্চিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]