অভিযুক্ত শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর শাস্তি দাবি সংশ্লিষ্টদের

আপলোড সময় : ২৮-০৪-২০২৬ ০৭:৪৫:২৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৪-২০২৬ ০৭:৪৫:২৫ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। একই সাথে অভিযুক্ত শিক্ষক ড. সুদীপ চক্রবর্তীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্যাম্পাসে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। মানববন্ধন থেকে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভাগের কিছু শিক্ষকের মানসিক ও ব্যক্তিগত নিপীড়নের পরিবেশই এ মৃত্যুর পেছনে দায়ী।

বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহিন বলেন, “প্রথমে আমাদের প্রিয় ছাত্রী, যে আজ আমাদের মাঝে নেই, তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

আজকের এই আয়োজনের সঙ্গে আমিএ কাত্মতা প্রকাশ করছি। তবে বড় বড় স্লোগান দিয়ে লাভ নেই- আমাদের সবারই নিজের দিকে তাকানো উচিত। ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে আত্মসমালোচনা করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “১৯৯৫ সালে পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে এই বিভাগে যোগ দিয়েছি। এই বিভাগ আমরা তৈরি করেছি। যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেগুলো সামনে আসুক। আমরা এখানে আছি, প্রতিদিন থাকবো। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। এখানে কোনো ধরনের ইন্টারফেয়ারেন্সের ঝুঁকি নেই, এটা আমরা আশ্বস্ত করতে পারি। দীর্ঘদিনের শোষণ বা নিপীড়নের অভিযোগ থাকলে সেটাও আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গা। সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে সমাজে যে উগ্রতা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় আমাদের বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যাতে প্রতিপক্ষ এই সুযোগে সাংস্কৃতিক বিভাগগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ বা বন্ধ করার চেষ্টা করে।”

বিভাগের শিক্ষার্থী আনিয়া আক্তার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত ও মানসিক নিপীড়নের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মিমোর অকালমৃত্যু সেই বাস্তবতারই একটি পরিণতি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চাই।”

তিনি ক্যাম্পাসে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হওয়া উচিত সম্মান ও স্নেহের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষক আমাদের সেই সম্মান দেন না; বরং আমাদের দাসের মতো মনে করেন। নিয়মিত বডি শেমিং, মানসিক হয়রানি, অপমানজনক আচরণের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মিমো আপুর ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে আমরা মনে করি।”

তিনি বলেন, “একজন শিক্ষার্থী যদি কোনোভাবে বেঁচে যেত, তবুও তাকে প্রতিদিন নানা অপমানের মুখোমুখি হতে হতো। শিক্ষকরা অনেক সময় নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব আচরণকে ‘জাস্টিফাই’ করার চেষ্টা করেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক, এখানে সম্মানজনক সম্পর্ক থাকা উচিত।”

বিভাগের চেয়ারপারসন কাজী তামান্না হক বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবি আমাদেরও দাবি। এ ঘটনায় যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, আমরা তা নিয়েছি। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষক ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”

মানববন্ধনে বক্তব্য আরও বক্তব্য রাখেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা।

তিনি বলেন, “মিমো আপু তার জীবন দিয়ে একটি সিস্টেমের দিকে আঙুল তুলে দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেওয়া হয় এবং তার বিচার চাওয়ার জন্য আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হয়।”

তিনি বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য একপাক্ষিক হয়ে গেছে। পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর শিক্ষকদের হাতে থাকে, যা অনেক সময় চাপ বা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশে এর আগেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেগুলোর বিচার অনেক সময় শেষ পর্যন্ত হয় না।”

হেমা চাকমা আরও বলেন, “সব শিক্ষক এমন নন, অনেক শিক্ষক আছেন যারা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু কিছু শিক্ষকের আচরণের কারণে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। অনেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ভয় বা সামাজিক কারণে কথা বলতে পারে না। এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।”

তিনি বলেন, “নিপীড়নবিরোধী সেলে অভিযুক্ত শিক্ষকই যুক্ত থাকার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে, ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে কাঠামোগতভাবে চলমান থাকতে পারে। আমরা চাই, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হোক এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থীকে এভাবে প্রাণ দিতে না হয়।”

মানববন্ধন থেকে শিক্ষার্থীরা সাত দফা দাবি জানান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: অভিযুক্তদের স্থায়ী বহিষ্কার, নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি সহায়তা প্রদান এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষকের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা।

এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগী অধ্যাপক ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে বিভাগের সব ধরনের একাডেমিক দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিভাগীয় চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমার সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশেষ একাডেমিক কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আইনগত প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ড. সুদীপ চক্রবর্তী বিভাগের সব ধরনের ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিভাগের ২০২৪ সালের এমএ দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর আকস্মিক মৃত্যুতে বিভাগ শোকাহত। এ ঘটনায় ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করেছে এবং মামলার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ, গত রোববার ভোরে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি বাসা থেকে মুনিরা মাহজাবিন মিমোর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে ওই দিন বিকেলে রাজধানীর উদয় ম্যানসন এলাকা থেকে ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করা হয়।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]