জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়ির বেহাল দশা

আপলোড সময় : ১৮-০৪-২০২৬ ১১:১৯:৫৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৮-০৪-২০২৬ ১১:১৯:৫৩ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি এক সময় ছিল গৌরব, ঐশ্বর্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির প্রতীক। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলা দেবীর স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনাটি সময়ের বিবর্তনে আজ ধ্বংসের মুখে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অবহেলা এবং দখলদারিত্বের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা। এটি রক্ষায় দ্রুত সরকারের পদক্ষেপ আশা করেছেন স্থানীয়রা।
 
জানা যায়, তেওতা জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাবু হিম শংকর রায় চৌধুরী ও কিরণ শংকর রায় চৌধুরী। যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় আট একর জায়গাজুড়ে আঠারো শতকের শেষদিকে গড়ে ওঠে এই বিশাল প্রাসাদ। সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে নির্মিত এই বাড়িটি একসময় মানিকগঞ্জ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখান থেকেই পরিচালিত হতো শাসনব্যবস্থা, কর আদায় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

জমিদার বাড়িটিতে মোট ৫৫টি কক্ষ রয়েছে। বাড়ির সামনে রয়েছে শান বাঁধানো বিশাল ঘাটসহ লাল শাপলার পুকুর, যার জলে প্রতিফলিত হয় প্রাসাদের মনোরম অবয়ব। মনে হয় যেন পানির নিচে আরেকটি রাজপ্রাসাদ লুকিয়ে আছে।

এছাড়া প্রাসাদের ভেতরে আরেকটি পুকুর রয়েছে, যদিও বর্তমানে তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। প্রাসাদের সামনে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ এবং চারপাশে সারি সারি তালগাছ পুরো পরিবেশকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

তিনতলাবিশিষ্ট এই স্থাপনাটি পোড়া মাটির ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। কাঠ, লোহা এবং চীনা মাটির সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি প্রতিটি অংশ ছিল নিপুণ শিল্পকর্মের উদাহরণ। দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র তৈরি হয়েছিল মজবুত শাল কাঠ দিয়ে।

প্রাসাদের উত্তর পাশে ছিল একটি নাটমন্দির, যেখানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পূজা-অর্চনা করতেন। মন্দিরের ভেতরে ছিল বিভিন্ন দেবদেবীর পিতলের মূর্তি।

এখানে জমিদারদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা কক্ষ ছিল, এমনকি কয়েদিদের আটকে রাখার জন্য বন্দিশালাও ছিল। প্রাসাদের মাঝখানে ছিল অন্দরমহল। প্রজারা কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের পূর্বদিকে অবস্থিত অন্ধকূপে বন্দি করে রাখা হতো। দক্ষিণ পাশে দুটি অট্টালিকার মাঝখানে টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশাল নাট্যশালা, যেখানে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

এই জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল নবরত্ন দোলন মঞ্চ। প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ ফুট উচ্চতার এই নবরত্ন মঠটি ১৮৫৮ সালে নির্মিত হয় এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম নবরত্ন মঠ হিসেবে পরিচিত। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ১৯০৬ সালে পুনরায় সংস্কার করা হয়। জমিদাররা একসময় এখানে মাসব্যাপী দোলযাত্রার আয়োজন করতেন, যা ছিল এলাকার অন্যতম প্রধান উৎসব।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই জৌলুস হারিয়ে গেছে। দেবদাসীদের নৃত্য, শঙ্খধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া—সবই আজ অতীতের স্মৃতি। এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।

তেওতা গ্রামের বিশেষ গুরুত্ব বেড়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলা দেবীর স্মৃতির কারণে। প্রমীলা দেবী ছিলেন তেওতা গ্রামেরই মেয়ে। তার ডাকনাম ছিল দুলি। তিনি বসন্ত কুমার সেন ও গিরিবালা সেন দম্পতির কন্যা। জমিদার হিম শংকর রায় তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। নজরুল ইসলাম প্রায়ই এই জমিদার বাড়িতে আসতেন এবং রাতভর গান ও কবিতার আসর বসাতেন।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]