তিস্তায় নাব্য সংকট ও ভাঙনে উদ্বাস্তু হচ্ছেন গঙ্গাচড়ার চরাঞ্চলের মানুষ

আপলোড সময় : ১৮-০৪-২০২৬ ১০:৪০:১৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৮-০৪-২০২৬ ১০:৪০:১৭ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী তিস্তায় গ্রীষ্মে নাব্য সংকট ও বর্ষায় ভাঙনে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে রংপুরের গঙ্গাচড়ার চরাঞ্চলের মানুষ। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি। শুষ্ক মৌসুমে নদী যেখানে পরিণত হয় ধু-ধু বালুচরে, সেখানে বর্ষা মৌসুম এলেই তা ভয়াবহ বন্যা ও তীব্র নদীভাঙনের রূপ নেয়। দুই ধরনের চরম অবস্থার মাঝখানে আটকে পড়ে সারা বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তিস্তা তীরবর্তী লক্ষাধিক মানুষ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, ভাঙনে বসতভিটা হারানো এবং জীবিকার অনিশ্চয়তায় এ জনপদের মানুষ এখন চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

বিশেষ করে নোহালী ইউনিয়নের মিনার বাজার থেকে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো আনন্দবাজার, বাগডহরা, মটুকপুর, বিনবিনা, ইচলি, শংকরদহ ও কাশিয়াবাড়ি, চরছালাপাক চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

শুষ্ক মৌসুম এলেই তিস্তার পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। অনেক স্থানে নদী শুকিয়ে গিয়ে বালুচরে পরিণত হয়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। নদীতে পানি না থাকায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, মাছের উৎপাদন কমে যায় এবং জেলে সম্প্রদায়ের মানুষজন কাজ হারিয়ে ফেলেন। কৃষকরাও সেচের পানির সংকটে পড়ে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকেন।স্থানীয় কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, শুকনা মৌসুমে পানি থাকে না, জমিতে সেচ দেওয়া যায় না। এতে ফসল উৎপাদন কমে যায়।

অন্যদিকে বর্ষা এলেই তিস্তা নদী হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদীর তীরে ভেঙে পড়ে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এবং ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। প্রতিবছর শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কেউ হারাচ্ছেন বসতভিটা, কেউ বা হারাচ্ছেন জীবিকার শেষ সম্বল।

প্রবীণ আলতাফ হোসেন বলেন, আমার জীবনের সত্তর বছর তিস্তার ভাঙন আর বন্যা দেখে কেটে গেছে। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত একই চিত্র শুকনা মৌসুমে পানি নেই, আর বর্ষায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বহু সরকার এসেছে, অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে কোনো স্থায়ী কাজ হয়নি। এখন বয়স হয়ে গেছে, আর বেশি কিছু চাই না। শুধু চাই, একটা বাঁধ নির্মাণ হোক, যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্তত শান্তিতে থাকতে পারে।

আউলীয়ার হাট এলাকার শফিকুল বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি তিস্তার ভাঙন। আমার বাবাকে নিজের হাতে নয়বার বাড়ি সরাতে হয়েছে। প্রতিবার নতুন করে ঘর বানিয়েছি, আবার নদী এসে তা নিয়ে গেছে। আমাদের জীবনে কোনো স্থায়িত্ব নেই। কখন যে ঘর ভেঙে যাবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। অনেক প্রতিবেশী এলাকা ছেড়ে চলে গেছে, কেউ শহরে, কেউ অন্য জেলায়। আমরা এখনো এখানে টিকে আছি কষ্ট করে। একটা বাঁধ হলে আমরা অন্তত নিরাপদে থাকতে পারতাম।

নোহালী চর আনন্দবাজার এলাকার স্নাতক শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, শুকনা মৌসুমে হেঁটে নদী পার হওয়া যায়, কিন্তু বর্ষায় নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব নয়। এতে নিয়মিত ক্লাস করা কঠিন হয়ে যায়।

ইচলি গ্রামের স্কুলছাত্রী রিমা আক্তার জানায়, আমাদের স্কুল নদীতে ভেঙে গেছে। এখন অনেক দূরে গিয়ে পড়তে হয়। বর্ষায় রাস্তা ভেঙে গেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ও বন্যার কারণে এ অঞ্চলে কোনো স্থায়ী উন্নয়ন গড়ে উঠেনি। প্রতিবছর বরাদ্দ এলেও তা টেকসই সমাধান দিতে পারছে না। বর্ষার পানিতে অনেক উন্নয়ন কাজই ভেসে যায়। মিনার বাজার থেকে মহিপুর পর্যন্ত একটি স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণই হতে পারে দীর্ঘদিনের সমস্যার একমাত্র সমাধান। কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা চাই একটি বাঁধ। এতে আমরা নিজেরাই চলতে পারব।

গঙ্গাচড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছি এবং স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি ও দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছি।

রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী তিস্তা সমস্যাকে উত্তরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির কেন্দ্রীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, তিস্তা নদী শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবনরেখা। এর সমাধান ছাড়া এ অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। বিলে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]