এস. এম. জালাল উদ্দীন, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায়ের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘লাই হারাওবা’ উৎসব তিনদিনব্যাপী আয়োজন শেষে বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন পরিবেশে সমাপ্ত হয়েছে। শুক্রবার রাতে উপজেলার তেতইগাঁওয়ের মণিপুরি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে উৎসবের শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানুষের গভীর বিশ্বাসের অনন্য মেলবন্ধন ‘লাই হারাওবা’—যা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং মণিপুরি জনগোষ্ঠীর জীবন্ত ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। বুধবার দুপুরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এবারের আয়োজনটি ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।
উৎসবে বিশেষ মাত্রা যোগ করে UNESCO Bangladesh এবং Bangladesh National Museum-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে আগত গবেষক ও শিল্পীদের অংশগ্রহণে এটি রূপ নেয় দুই দেশের ঐতিহ্যের এক মিলনমেলায়।
বৈশাখের উষ্ণতা উপেক্ষা করে প্রতিদিন বিকেল থেকে প্রাঙ্গণে ভিড় জমাতে থাকেন নানা বয়সী দর্শনার্থীরা। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আসা দর্শকদের পদচারণায় উৎসবস্থল ধীরে ধীরে রঙিন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। অংশগ্রহণকারীদের বর্ণিল পোশাক, কিশোরী-তরুণীদের খোঁপায় ময়ূরের পেখম, শিশুদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে উৎসব যেন এক চলমান শিল্পকর্মে রূপ নেয়।
প্রাঙ্গণজুড়ে বসে নানা ধরনের দোকান—খেলনা, প্রসাধনী, পিঠা-পুলি, পেঁয়াজু, বেগুনি ও ঝালমুড়ি—যা উৎসবকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
শেষ দিনের বিকেল থেকেই জমে ওঠে মূল আয়োজন। শামিয়ানার নিচে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়, আর মঞ্চের পেছনে প্রস্তুত কুশীলবরা। ঢোল, খোল ও বাঁশির সুরে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সূর্যাস্তের পর শুরু হয় ‘লাই হারাওবা জগোই’—উৎসবের প্রাণকেন্দ্র।
এই নৃত্য কেবল বিনোদন নয়, বরং সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রকৃতি ও মানবজীবনের বিভিন্ন ধাপের প্রতীকী উপস্থাপনা। মাইবি বা নারী পুরোহিতদের নেতৃত্বে পরিবেশিত এই নৃত্যে সুর, তাল ও মুদ্রার মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয় এক পবিত্র আধ্যাত্মিক আবহ, যেখানে দর্শকরাও যেন নিঃশব্দে সেই অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠেন।
আয়োজকদের মতে, ‘লাই’ অর্থ দেবতা এবং ‘হারাওবা’ মানে আনন্দ—অর্থাৎ এটি দেবতাদের আনন্দোৎসব। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই উৎসব মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে আছে।
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য রবি কিরণ সিনহা (রাজেশ) বলেন, “লাই হারাওবা শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ।” সদস্য সচিব ওইমান লানথই জানান, “এই উৎসব প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্কের গভীর প্রতিফলন।” আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা (শ্যামল) বলেন, “মাইবিদের নৃত্য নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।”
এবারের আয়োজনে নির্ধারিত প্রধান অতিথি মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে জেলা বিএনপির সদস্য দুরুধ আহমেদ অংশগ্রহণ করেন।
সব মিলিয়ে ‘লাই হারাওবা’ উৎসব আবারও প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মাঝেও ঐতিহ্য যে ভালোবাসা ও সম্মানে টিকে থাকতে পারে, এই আয়োজন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।