রাহাদ সুমন,বরিশাল ::
ভোরের আলো ফুটতেই একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ কান পেতে থাকতেন রেডিওর দিকে। সমুদ্রের গর্জন, আকাশের মেঘ আর জীবনের অনিশ্চয়তার মাঝে ছোট্ট একটি বেতার সেটই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। ঘূর্ণিঝড় আসছে কিনা, নদীর পানি বাড়ছে কিনা এসব খবর পৌঁছে যেত এই বেতারের মাধ্যমেই। কিন্তু আজ সেই বেতারই যেন নীরব। শব্দ আছে, কিন্তু পৌঁছায় না। তরঙ্গ আছে, কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে না।
ভোরের আলো ফুটতেই একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ কান পেতে থাকতেন রেডিওর দিকে। সমুদ্রের গর্জন, আকাশের মেঘ আর জীবনের অনিশ্চয়তার মাঝে ছোট্ট একটি বেতার সেটই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। ঘূর্ণিঝড় আসছে কিনা, নদীর পানি বাড়ছে কিনা এসব খবর পৌঁছে যেত এই বেতারের মাধ্যমেই। কিন্তু আজ সেই বেতারই যেন নীরব। শব্দ আছে, কিন্তু পৌঁছায় না। তরঙ্গ আছে, কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে না।
যে বেতার কেন্দ্রটি একসময় দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে মানুষের তথ্য ও নিরাপত্তার নির্ভরতার প্রতীক ছিল, সেই কেন্দ্রের এফএম সিগন্যাল এখন মাত্র ১ কিলোমিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মিডিয়াম ওয়েভ সিগন্যালও ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি পৌঁছাতে পারছে না। ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র রাষ্ট্রীয় বেতার কেন্দ্র বাংলাদেশ বেতার বরিশাল।
বর্তমানে কেন্দ্রটি থেকে ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার মিডিয়াম ওয়েভ এবং ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এফএম ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রতিদিন দুই অধিবেশনে মোট ১৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব অনুষ্ঠান অধিকাংশ শ্রোতার কাছে পৌঁছায় না। এমনকি বরিশাল মহানগরীর অনেক এলাকাতেও পরিষ্কারভাবে এফএম সম্প্রচার শোনা যাচ্ছে না।
এই বেতার কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ উপকূলের মানুষকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, প্লাবনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে কেন্দ্রটি। ফলে উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ বেতার বরিশাল কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়। তখন বরিশাল শহরের পশ্চিম প্রান্ত রুইয়া এলাকায় প্রায় ২৫ একর জমিতে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি রেডিও স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর প্রকল্পটি অনিশ্চয়তায় পড়ে এবং ১৯৮২ সালে সেনাশাসক এরশাদের সময় তা বাতিল করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এবং বরিশাল সদর আসনের এমপি আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিষয়টি আবার সামনে আসে। উপনির্বাচনে নির্বাচিত এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রপতির নজরে আনেন। রাষ্ট্রপতির নির্দেশে তৎকালীন তথ্য সচিব নুর উদ্দিন আল মাসুদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।
১৯৯২ সালের জুনের মধ্যে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। একই অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে একনেকের অনুমোদন লাভ করে প্রকল্পটি।
এরপর বরিশাল মহানগরীর রূপাতলী এলাকায় প্রায় ১৮.৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয় এবং ১৯৯৬ সালের ৩০ জুন কেন্দ্রটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়নি। পরবর্তীতে বরিশাল সদর আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করলে তিন বছর পর, ১৯৯৯ সালের ১২ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
কেন্দ্রটির ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের আগেই এর আয়ুষ্কালের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে নিয়মিত আধুনিকায়নের পরিবর্তে মেরামত ও জোড়াতালি দিয়ে কোনোভাবে সম্প্রচার চালু রাখা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গত সপ্তাহেই এফএম ট্রান্সমিটার টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর কোনোভাবে চালু করা সম্ভব হয়। তবে বর্তমানে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এফএম ট্রান্সমিটার কার্যত ১ থেকে ২ কিলোওয়াট ক্ষমতায় নেমে এসেছে।
স্থানীয় সুধী সমাজ ও সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বেতার বরিশাল কেন্দ্রটি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন কেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় সুধী সমাজ কেন্দ্রটির আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নের দাবি জানান। বিশেষ করে মিডিয়াম ওয়েভে ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ট্রান্সমিটার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। মন্ত্রী এ বিষয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন,বাংলাদেশ বেতার বরিশাল শুধু একটি সম্প্রচার কেন্দ্র নয়। এটি উপকূলীয় মানুষের জন্য দুর্যোগকালীন জীবনরক্ষাকারী মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে এটি আজ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রয়েছে।দক্ষিণাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ বেতার কেন্দ্রটি তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলবে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপকূলের অসহায় মানুষগুলো।
বরিশাল বেতার কেন্দ্রের পরিচালক কিশোর রঞ্জন মল্লিক বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি শ্রোতাদের কাছে সিগন্যাল পৌঁছে দিতে। তবে ট্রান্সমিটারগুলো দীর্ঘদিনের পুরনো। চলতি বছরের মধ্যেই নতুন ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এফএম ট্রান্সমিটার স্থাপনের লক্ষ্যে শিগগিরই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।