জুলাই সনদ বাস্তবায়ন : সরকারের দায় ও বাস্তবতা

আপলোড সময় : ০৭-০৪-২০২৬ ১০:৫৭:৪৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৭-০৪-২০২৬ ১০:৫৭:৪৪ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব বাঁকবদল। দেড় দশকেরও বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তার দালিলিক ও আইনি রূপরেখা ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এই সনদটি শুধু একটি রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন সামাজিক চুক্তির (Social Contract) প্রতিফলন, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বৈরাচারমুক্ত করার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে গঠিত হয়েছিল।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের যে ধরনের ‘গড়িমসি’ বা দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে । নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এই সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রচলিত সংবিধানের গণ্ডিতে আটকে রাখার চেষ্টা বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুতই একটি গণবিপ্লবে রূপ নিয়েছিল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে যা চূড়ান্ত রূপ পায়। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল জেনারেশন জি (Gen-Z), যারা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার চেয়েছিল। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার ও জুলাইয়ে গণহত্যাকারী সরকারের পতন হলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় । এই সরকারের প্রধান অঙ্গীকার ছিল তিনটি—বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন। সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই সুপারিশগুলোর ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা শুরু হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’—এ দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্র হলো মূলত ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতিমূলক দলিল, যার মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ হলো সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের একটি রূপরেখা, যা আগামী দিনের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো কেমন হবে, তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করে। এই সনদে ২৮টি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনি ব্যবস্থা, পুলিশ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রাথমিক সংস্কার কমিশন গঠন করে । পরে এর পরিধি বেড়ে ১১টি কমিশনে উন্নীত হয় । এই কমিশনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ নাগরিক, বিশেষজ্ঞ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ (এনসিসি) গঠিত হয় । এই কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৭২ দিনব্যাপী আলোচনার পর ১৬৬টি প্রস্তাব থেকে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাবনাগুলোই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]