এম মনির চৌধুরী রানা
বিদায়ী মার্চে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ৬১৬ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬১৯ জন নিহত, ১৫৪৮ জন আহত হয়েছে। এই মাসে রেলপথে ৪৫ টি দুর্ঘটনায় ৫৪ জন নিহত, ২২৯ জন আহত হয়েছে । তথ্যমতে, নৌ পথে ০৯ টি দুর্ঘটনায় নিহত ০৯ জন, আহত ১৯ জন ও ০৩ জন নিখোঁজ রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সর্বমোট ৬৭০ টি দুর্ঘটনায় ৬৮২ জন নিহত এবং ১৭৯৬ জন আহত হয়েছে। এই সময়ে ২২২ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৩৭ জন নিহত, ১৯৭ জন আহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৬.০৩ শতাংশ, নিহতের ৩৮.৬১ শতাংশ ও আহতের ১২.৭২ শতাংশ। এই মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে ঢাকা বিভাগে ১৬০ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৭০ জন নিহত ও ৩২০ জন আহত হয়েছে, সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে বরিশাল বিভাগে ৩০ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ১২২ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণে এই তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত হতাহতের ঘটনা আরো বেশ কয়েকগুন বাড়তে পারে। যা সংবাদপত্রে স্থান না পাওয়ায় তুলে আনা সম্ভব হয়নি।
আজ ০৪ এপ্রিল শনিবার সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বার্তায় এই প্রতিবেদন তুলে ধরেন।
সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ০৯ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১৫৭ জন চালক, ৯০ জন পথচারী, ১৭ জন পরিবহন শ্রমিক, ৬৮ জন শিক্ষার্থী, ১৫ জন শিক্ষক, ৭৮ জন নারী, ৮৬ জন শিশু, ০৩ জন চিকিৎসক, ০৪ জন সাংবাদিক, ০১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ০১ আইনজীবি, ০৩ প্রকৌশলী এবং ১৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে। এদের মধ্যে নিহত হয়েছে- ০৫ জন পুলিশ সদস্য, ০১ জন আনসার সদস্য, ০১ জন বিজিবি সদস্য, ০১ জন্য ফায়ার সার্ভিস সদস্য, ০১ জন চিকিৎসক, ০১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৫০ জন বিভিন্ন পরিবহনের চালক, ৮৪ জন পথচারী, ৭৪ জন নারী, ৮২ জন শিশু, ৬৭ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন পরিবহন শ্রমিক, ১৪ জন শিক্ষক, ০১ আইনজীবি, ০৩ প্রকৌশলী ও ৯ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।
এই সময় সড়ক দুর্ঘটনায় সংগঠিত ৯৭৫ টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে। এতে দেখা যায়, ২৬.৭৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১.৬৪ শতাংশ ট্রাক-পিকাপ-কাভার্ডভ্যান ও লরি, ১৩.৮৪ শতাংশ বাস, ১৪.৫৬ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক, ৭.২৮ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ৮.৪১ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা, ৭.৪৮ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস সড়কে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৩২.৪৬ শতাংশ গাড়ি চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা, ৩৭.৬৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২১.৪২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৭.১৪ শতাংশ বিবিধ কারনে, ০.৩২ চাকায় ওড়না পেছিয়ে এবং ০.৯৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষে ঘটে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মাসে সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪০.৯০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.০৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২২.০৭ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়াও সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫.৫১ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৪৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ০.৯৭ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে, মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ :
১. দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিক্সা, অটোরিক্সা অবাধে চলাচল।
২. জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা, রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা।
৩. সড়কে মিডিয়ামে রোড ডিভাইডার না থাকা, অন্ধবাঁেক গাছপালায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।
৪. মহাসড়কের নির্মান ত্রুটি, যানবাহনের নানাবিধ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।
৫. উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।
৬. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন।
৭. বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং একজন চালক অতিরিক্ত সময় ধরে যানবাহন চালানো।
৮. ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের কারণে বাসের ছাদে, খোলা ট্রাক ও পিকআপে, ট্রেনের ছাদে, বাসের ইঞ্জিন বনাটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণের যাতায়াত।
দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ :
১. সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতির চালু করা।
২. মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা আমদানী ও নিবন্ধন বন্ধ করা।
৩. জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় অবাধে চলাচলের জন্য আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা।
৪. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহন, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান।
৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘন্টা ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা।
৬. পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।
৭. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা।
৮. সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা।
৯. মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা।
১০. উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওর্য়াক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
১১. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা।
১২. সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু করা।
১৩. ঈদযাত্রা একসাথে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী নানা পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি ঢাকা উপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর দাবী জানাচ্ছি।