ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জনজীবন বিপর্যয়; অনুমোদনের অপেক্ষায় ৮৫০ কোটি টাকার তীর সংরক্ষণ প্রকল্প

আপলোড সময় : ২৬-০৩-২০২৬ ০৩:৫৭:৩১ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৬-০৩-২০২৬ ০৩:৫৭:৩১ অপরাহ্ন

 
 
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
 
উত্তরাঞ্চলের নদীবিধৌত জেলা কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েক দশক ধরে চলমান এ ভাঙনে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে, বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ।
 
জানা গেছে, ভারতের আসাম থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও চর রাজিবপুর হয়ে প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধা ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদে গিয়ে যমুনা নামে পরিচিত হয়।
 
নারায়ণপুর থেকে রাজিবপুর পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত ভাঙনে জেলার ভৌগোলিক চিত্র বদলে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার বহু ইউনিয়ন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ভাঙনের শিকার হয়েছে। এতে কয়েক লাখ মানুষ একাধিকবার ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
 
নদীভাঙনে কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনাসহ বিপুল সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় জেলার অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
 
এ অবস্থায় কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ব্রহ্মপুত্র নদের বাম তীর সংরক্ষণে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পের আওতায় রৌমারী, রাজিবপুর ও উলিপুর উপজেলার প্রায় ১৬ দশমিক ৩০৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
 
প্রকল্পটির সম্ভাব্য মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। এতে উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা, হবিগঞ্জ বাজার, নামাজের চর, সোনাপুর, ঘুঘুমারি ও সুখের বাতি এলাকা, রৌমারীর ফুলুয়ার চরঘাট এবং রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি, হাজীপাড়া ও চর নেওয়াজী এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
 
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সম্পন্ন করে তা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গত ২ মার্চ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
 
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, তারা বারবার ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা এলাকার বাসিন্দা মোঃ শরাফত আলী (৫৬) বলেন, ‘জীবনে পাঁচ বার ঘর বানাইছি, সবই নদীতে গেছে। এখন কোথায় থাকব বুঝি না।’
 
একই এলাকার মোছাঃ রাহেলা খাতুন বলেন, ‘নদী আমার সব নিয়ে গেছে। সন্তানদের নিয়ে অন্যের জমিতে থাকি, বর্ষা এলেই ভয় লাগে।’
 
রৌমারী উপজেলার ফুলুয়ার চর এলাকার কৃষক মোঃ জাইদুল ইসলাম (৫০) জানান, নদীগর্ভে তার ১০ বিঘা জমি বিলীন হওয়ায় এখন দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
 
চর রাজিবপুর উপজেলার বাসিন্দা মোছাঃ জরিনা খাতুন বলেন, ‘বারবার ঘর হারিয়ে আর টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা গৃহহীন হয়ে পড়বো।’
 
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘মানুষ পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত স্থান পরিবর্তন করেছে। টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে।’
 
রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার জনপ্রতিনিধিরাও ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
 
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক মোঃ শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির নদী। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ মিটার করে তীর ভেঙে নদী প্রশস্ত হচ্ছে। এতে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও সামাজিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য ও মানবিক সংকটকে তীব্র করছে।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘তীর সংরক্ষণের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।’
 
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’
 
স্থানীয়দের আশা, প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে জেলার হাজারো মানুষ এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে চরাঞ্চলের জনজীবনে।



 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]