এস. এম. জালাল উদদীন: মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক ইতিহাসে যে কয়েকটি পরিবার বিশেষভাবে আলোচিত, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো জনহিতৈষী হাজী ইনজাদ আলী পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারটি কেবল নেতৃত্বই দেয়নি, বরং মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা, দানশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বংশপরম্পরায় মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে এই পরিবার।
দানশীলতা ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা
হাজী ইনজাদ আলী ছিলেন একজন দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক ও মানবদরদী ব্যক্তিত্ব। এমন এক সময়ে তিনি সমাজসেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, যখন এ অঞ্চলে শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা ছিল অত্যন্ত সীমিত। মানুষের কল্যাণে তিনি উদারহস্তে দান করেছেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্যতম প্রধান দাতা হিসেবে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। পাশাপাশি কুলাউড়া ডিগ্রি কলেজ ও জুড়ী হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে তাঁর অবদান এ অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আজও এলাকার মানুষকে জ্ঞান ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
একই পরিবারে চার চেয়ারম্যান: এক বিরল ইতিহাস
১৯৮৮ সালের ৫ এপ্রিল জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভার-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে এক বিরল ঘটনা। বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হাজী ইনজাদ আলীর পরিবারের চার সদস্য বিপুল ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
তাঁরা হলেন—
আছাদ উদ্দিন আহমদ (বটল) — বড়লেখা উপজেলা চেয়ারম্যান,
কমর উদ্দিন আহমদ (কমই) — গোয়ালবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান,
মইন উদ্দিন আহমদ (মইজন) — পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান,
ছালেহ উদ্দিন আহমদ — পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
একই পরিবারের চারজন সদস্যের একযোগে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার এই ঘটনা তখন গোটা দেশে আলোচনার জন্ম দেয় এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঐতিহ্যের ধারায় নেতৃত্ব:
পরবর্তীতেও এই পরিবারের নেতৃত্বের ধারা অব্যাহত থাকে। সামাজিক ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন পরিবারের আরও সদস্য।
উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন—
শফিক উদ্দিন আহমদ — সাবেক চেয়ারম্যান
আতিথেয়তা ও সামাজিক প্রভাব
হাজী ইনজাদ আলী পরিবারের সুনাম কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়।
আতিথেয়তা, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য এই পরিবারটি এলাকায় বিশেষভাবে সম্মানিত। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক বিরোধ মীমাংসা, সালিশ-বিচার এবং মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে আসছেন।
এই পরিবারের মার্জিত জীবনধারা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে আছে।
অবিরাম পথচলা
হাজী ইনজাদ আলীর উত্তরসূরিরা আজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেউ রাজনীতি, কেউ প্রশাসন, আবার কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিবারের সম্মান ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছেন।
বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার উন্নয়ন ও জনকল্যাণে এই পরিবারের অবদান মৌলভীবাজারের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা
হাজী ইনজাদ আলীর আদর্শকে ধারণ করে তাঁর উত্তরসূরিরা যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। জুড়ী অনলাইন প্রেসক্লাব ও হাকলুকি নিউজ টিভি এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।