ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ৮৫ দেশে

আপলোড সময় : ১১-০৩-২০২৬ ০৮:৪৩:০৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-০৩-২০২৬ ০৮:৪৩:০৭ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি দেশে হু হু করে বাড়ছে পেট্রল ও ডিজেলের দাম। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো সংকটের মুখে পড়েছে।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গত ফেব্রুয়ারিতে নিয়মিত এক গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল ২ দশমিক ৯৪ ডলার, যা বর্তমানে ২০ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৫৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে দাম গ্যালন প্রতি ৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

গ্লোবাল পেট্রল প্রাইসেস-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৮৫টি দেশে পেট্রলের দাম বেড়েছে। শতাংশের হিসেবে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ভিয়েতনামে। দেশটিতে লিটার প্রতি পেট্রলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে শূন্য দশমিক ৭৫ ডলার থেকে ১ দশমিক ১৩ ডলারে পৌঁছেছে। এরপরই রয়েছে লাওস (৩৩ শতাংশ), কম্বোডিয়া (১৯শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (১৮শতাংশ) এবং যুক্তরাষ্ট্র (১৭শতাংশ)।

এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাসের জন্য প্রধানত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই পথটি বর্তমানে বন্ধ থাকায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া চরম সংকটে পড়েছে। জাপান তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পেট্রল ও ডিজেলের ওপর সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। আর্থিক সক্ষমতা কম থাকায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি অফিসগুলোতে চার দিনের কর্মদিবস চালু করা হয়েছে এবং স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়ে ৫০ শতাংশ ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নীতি কার্যকর করা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দামও। কারণ সারের উৎপাদন থেকে শুরু করে ফসল পরিবহন—প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস আল জাজিরাকে বলেন, পরিবহন হলো বিশ্ব অর্থনীতির জীবনশক্তি। সরবরাহ ব্যবস্থা ও লজিস্টিকস বিঘ্নিত হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব একসঙ্গে বাড়ার ফলে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ শব্দটি দুটি ইংরেজি শব্দ থেকে এসেছে—স্ট্যাগনেশন (অর্থনৈতিক স্থবিরতা) ও ইনফ্লেশন (মূল্যস্ফীতি)। এটি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে একই সময়ে তিনটি সমস্যা দেখা দেয়—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব ধীর বা থেমে যায়, বেকারত্ব বাড়ে এবং দাম বা মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালে তেলের দাম বাড়ার পরেই বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল।

তবে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কেবল গাড়ি চালানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য হাজার হাজার পণ্য খনিজ তেল থেকে তৈরি হয়। যেমন—প্লাস্টিকের পানির বোতল, খাবারের প্যাকেজিং, ফোনের কেসিং এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সিরিঞ্জ তৈরিতে তেল প্রয়োজন। কাপড় বা সিনথেটিক তন্তু যেমন পলিয়েস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রাইলিক, যা খেলাধুলার পোশাক থেকে শুরু করে কার্পেট তৈরিতে তেল ব্যবহৃত হয়।

বিভিন্ন প্রসাধনী যেমন—ভ্যাসলিন, লিপস্টিক এবং কনসিলার তৈরিতেও তেল প্রয়োজন। গৃহস্থালি পণ্যের মধ্যে ডিটারজেন্ট, ডিশওয়াশিং লিকুইড এবং রঙ তৈরিতেও প্রয়োজন হয় তেলের। এ ছাড়া কৃষি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সার প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়।

এশিয়া ছাড়া ইউরোপেও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা জরুরি বৈঠক করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ গ্রাহকদের ওপর চাপ কমাতে জরুরি কৌশলগত মজুতের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, আরব উপদ্বীপ এবং ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ধমনি হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশেরই ভোক্তা দক্ষিণ এশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]