ভাষার রাজনীতি রাজনীতির ভাষা

আপলোড সময় : ২৮-০২-২০২৬ ১২:৪৯:৪০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০২-২০২৬ ১২:৪৯:৪০ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতাটি অনেকবার পড়েছি; বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয়নি। এমনকি বুঝতে পারব সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছি। আমি ছাড়লে কী হবেকবিতাটি কিন্তু আমায় ছাড়েনি। মাঝেমধ্যেই সে নীরবে হেঁটে হেঁটে আমার কাছে এসে চুপচাপ বসে আর আস্তে আস্তে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘পড়ো।’ আমি অমনি সুবোধ বালকের মতো কবিতার বই খুলে পড়তে বসি। আমি পড়তে থাকি ‘আলো-অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে / স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে / স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয় / হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়।’ কবিতাটির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক না হলেও সম্প্রতি ‘ইনকিলাব’ শব্দটি কিছুটা হলেও ওই কবিতার মতোই আমাদের মাথার চারপাশে ঘুরতে থাকে। কিছুতেই তাকে এড়াতে পারছিনে। এই অবস্থা যে কেবল আমার একার তাও বলা যায় না। সম্ভবত অনেকেই অনেক দিন ধরে এই একই অবস্থার মধ্যে জলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। সম্প্রতি শব্দটির উৎস ও উৎপত্তি নিয়ে, বিকাশ ও বিস্তার নিয়ে এর পক্ষে ও বিপক্ষে বেশ ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে; বাহাস ও বিতর্ক হচ্ছে। সহসা এই বাহাস থামবে বলে মনে হচ্ছে না। কেউ কেউ শব্দটির আভিধানিক, পারিভাষিক এমনকি দার্শনিক অর্থও অনুধাবনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু শব্দটির আপত্তি তার উৎপত্তি ও উৎস নিয়ে নয়, তার সহি ও শুদ্ধতা নিয়েও নয়; আপত্তি শব্দটির প্রায়োগিক ব্যবহার ও তার সংগ্রামের অতীত ইতিহাস নিয়ে। এই একটি শব্দের মধ্যে শত বছরের শত শত জীবন ও জনপদের কান্না লুকিয়ে আছে; লুকিয়ে আছে নিপীড়িত আত্মার ব্যথা ও বেদনার অন্তহীন অশ্রুরেখা।

 
এই একটি শব্দ একদা একটি জনগোষ্ঠীকে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো জাগিয়ে তুলেছিল, প্লাবিত করেছিল এই অঞ্চলের যাপিত জীবন ও জনপদকে। এই একটি শব্দকে ধারণ করেই এই দেশের মজলুম জনতা শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল; রুখে দাঁড়িয়েছিল নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে। এই শব্দকে ধারণ করেই এই জনপদের মানুষ শেকল ভাঙার শপথ নিয়েছিল, শপথ নিয়েছিল মুক্তি ও মানবতার। এই শব্দকে ধারণ করেই নকশালবাড়ির দলিত-মথিত কৃষক সম্প্রদায় বিপ্লবে-বিদ্রোহে (১৯৬৭) জ্বলে উঠেছিল। যে বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল বহু জীবন ও জনপদে। বুলেটের মাধ্যমে সেদিন শাসক সম্প্রদায় নিদারুণভাবে ওই বিদ্রোহ দমন করেছিল। ওই বিদ্রোহের রক্তঝরা ইতিহাস লেখা রয়েছে কবিতা ও কথাসাহিত্যের পাতায় পাতায়। সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’ ও অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ উপন্যাসের কিছু চরিত্র ওই বিদ্রোহ দ্বারাই প্রভাবিত। এমনকি মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ ওই বিদ্রোহের রক্ত দিয়েই লেখা। এই উপন্যাসে পাতা উল্টালে আজও সহস্র মানুষ ও মায়ের আর্তনাদ এবং আহাজারির প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। তাই ইনকিলাব শব্দে সুপ্ত রয়েছে মূলত মানুষের ব্যথা ও বেদনার ইতিহাস, আর্তনাদ ও আহাজারির ইতিহাস। এই শব্দের অন্তর ও আড়ালে লুকিয়ে আছে শত-সহস্র মানুষের অস্ফুট কান্নার প্রতিধ্বনি; লুকিয়ে আছে অতীত ইতিহাসের আর্তি ও আর্তনাদ।
 
আজও মজলুম জনতা ইনকিলাব শব্দের মধ্য দিয়ে তার পূর্বপুরুষের ওই বেদনাময় ইতিহাসকেই স্মরণ করে; স্মরণ করে তার ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন ও সাধনাকে। এই শব্দের মধ্য দিয়ে আজও নিষ্পেষিত জনতা তার হারিয়ে যাওয়া বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকেই স্মরণ করে। আজও মজলুম জনতা ওই নিপীড়িত কণ্ঠের সঙ্গেই কণ্ঠ মেলাতে চায়। আজও জনতা ওই শব্দকে ধারণ করেই সমুদ্রের জোয়ারের মতো মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসে। আজও জনতা ওই শব্দকে ধারণ করেই হাতে হাত রেখে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আজও ওই শব্দকে ধারণ করেই মজলুম জনতা ঘন হয়ে বসে। আজও মজলুম জনতা কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সমস্বরে প্রতিধ্বনি তোলে ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। ওই শব্দকে ধারণ করেই এই বাংলায় এসেছিল বর্ষাবিপ্লব। তাই শব্দটিকে ঘিরে এত ভয়, এত শঙ্কা ও সংশয়। মূলত ইনকিলাব শব্দ কেবল সাধারণ একটি শব্দের সীমা কিংবা পরিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শব্দটি হয়ে ওঠে অধিকার আদায়ের হাতিয়ার; হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার বিপুল প্রত্যয় ও প্রত্যাশার প্রতীক। একই সঙ্গে এই শব্দের বুলন্দ আওয়াজে একশ্রেণির মানুষের হৃদয়াত্মা কেঁপে ওঠে; কেঁপে ওঠে তার সাধের আসন। তখন শোষক সম্প্রদায় ওই শব্দটিকে ভয় পায়। নানা অজুহাতে তারা ওই শব্দটিকেই বাতিল করতে চায়। শব্দ বাতিলের মধ্য দিয়ে তারা মূলত মজলুমের কণ্ঠস্বরকে নিভিয়ে দিতে চায়, নিস্তব্ধ করে দিতে চায়। তারা তাদের নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের নিদারুণ রক্তচিহ্ন ইতিহাসের খেরোখাতা থেকে মুছে দিতে চায়। কেবল ইনকিলাব নয়, রিফরমেশন শব্দটিও এই দেশে তেমন সমাদর পায় না। অর্থাৎ এই দেশের একশ্রেণির সুবিধাবাদী সম্প্রদায় প্রায় সবকিছু আলবত আগের মতোই রেখে দিতে চায়। লেখাটি শুরু করেছিলাম জীবনানন্দ দাশকে দিয়ে। শেষ করতে চাই ঐ জীবনানন্দ দাশকে দিয়েই। সুচেতনাকে সম্বোধন করে একদা কবিতার এই মহাজন লিখেছিলেন ‘সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে / সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ।’ হয়তো আমাদের দেশে আজও ওই মনীষীর আগমন ঘটেনি। কবে আসবে তাও দিনক্ষণ ঠিক করে বলা কঠিন। তবু আশায় বসতি।





 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]