রিলস-টিকটক সংস্কৃতির প্রভাব

আপলোড সময় : ২৩-০২-২০২৬ ০১:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-০২-২০২৬ ০১:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রযুক্তি পৃথিবীকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—‘মনোযোগ’। পৃথিবী আজ বৈশ্বিক গ্রাম। এখানে হাতের মুঠোয় সবকিছু পাওয়া যায়। আজ একটি অদৃশ্য শক্তি নিয়ে জানব। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব শর্টস রিলস ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকি। আমাদের নিজেদের অজান্তে বর্তমানে ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বেশির ভাগ সময় কেড়ে নিচ্ছে। ১৫-৬০ সেকেন্ডের ছোট ছোট ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই ‘শর্ট-ভিডিও’ সংস্কৃতি আমাদের মস্তিষ্কে যে প্রভাব ফেলছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ।

 
মনোযোগ কমে যাওয়া


আগে যেখানে একজন মানুষ টানা ৩০-৪০ মিনিট মনোযোগ দিয়ে পড়তে বা শুনতে পারত, বর্তমানে মাত্র ৫-১০ মিনিটের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যায়। বিশেষ করে, শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি প্রকট। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মন না বসা, বই পড়তে গিয়ে বারবার ফোন চেক করার মতো বাজে অভ্যাস তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটাল ড্রাগ ও ডোপামিন লুপ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এই ভিডিওগুলো মস্তিষ্কে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তুষ্টি তৈরি করে। প্রতিটি ১৫ সেকেন্ডের নতুন ভিডিও দেখার পর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ক্ষরণ ঘটে। এটি অনেকটা মাদকাসক্তির মতো আসক্তির জন্ম দেয়। একবার স্ক্রল করা শুরু করলে মস্তিষ্ক পরবর্তী হিটের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের অবচেতন মন ‘আরো একটি ভিডিও’ দেখার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ডোপামিন লুপ’।

অনর্থক কনটেন্টের জোয়ার

এই প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় সমস্যা হলো কনটেন্টের মান। ভাইরাল হওয়ার নেশায় মানুষ প্রতিদিন কুরুচিপূর্ণ, হাস্যকর এবং অর্থহীন ভিডিও তৈরি করছে। এসব ভিডিও একটির পর একটি দেখতে দেখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অজান্তেই নষ্ট করছি আমরা। শিশু-কিশোররা তো বটেই, প্রাপ্তবয়স্করাও এই ফাঁদে পড়ছেন নিয়মিত। পড়াশোনা, আত্মউন্নয়ন, পরিবার বা বিশ্রামের জন্য যে সময় ব্যয় হওয়ার কথা, তা চলে যাচ্ছে ফালতু অহেতুক স্ক্রলিংয়ে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে সময় ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা, কাজের প্রতি অনীহা ও লক্ষ্যহীনতা।

শিশু-কিশোরদের ঝুঁকি : গবেষণায় দেখা গেছে, একজন গড়পড়তা কিশোর দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা ব্যয় করছে এই রিলস বা শর্টস দেখে। যার অধিকাংশই অনর্থক। এর ফলে ভবিষ্যতে এক অসুস্থ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে আমাদের সমাজে।

সৃজনশীলতার মৃত্যু : ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্য মানুষের অর্থহীন কর্মকাণ্ড (রান্না ভিডিও,খাওয়ার ভিডিও, গাড়িতে চড়ার ভিডিও, পুতুল খেলা দেখা ইত্যাদি) দেখে সময় কাটানোর ফলে শিশু-কিশোরদের নিজস্ব চিন্তা করার ক্ষমতা এবং বই পড়ার মতো গভীর কাজ করার ধৈর্য হারিয়ে যাচ্ছে।

মনোযোগের সংকট

মাইক্রোসফটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের গড় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Attention Span) ১২ সেকেন্ড থেকে কমে মাত্র ৮ সেকেন্ডে দাঁড়িয়েছে। যেখানে একটি গোল্ডফিশের মনোযোগ ৯ সেকেন্ড! অর্থাৎ, ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওর বাইরে কোনো গভীর বিষয়, যেমন পড়াশোনা বা পেশাদার কোনো কাজে আমাদের মস্তিষ্ক দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দিতে পারছে না।
 
 
একে বলা হচ্ছে ‘টিকটক ব্রেইন’ সিনড্রোম। আগে মানুষ একটি বই বা দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়ত অনায়াসে। কিন্তু বর্তমানে তিন-চার মিনিটের বড় ভিডিও দেখলেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। লম্বা সময় নিয়ে চিন্তা করতে পারে না। কোনো কাজে মনোযোগী হতে পারে না। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে কোনো বিষয়ের গভীরতা থাকে না। ফলে মানুষ খণ্ডিত এবং অনেক সময় ভুল তথ্য নিয়ে সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়, যা অনেক সময় বিপদ বয়ে আনে। সারাদিন শত শত ভিডিও দেখার ফলে মস্তিষ্ক কোনো তথ্যই স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না, যা শেষ পর্যন্ত স্ট্রেস বা বিষণ্ণতা তৈরি করে।






 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]