ঢাকা , শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেনজীর এখন কোথায়!

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৯-০৪ ১০:২৩:৪৩
বেনজীর এখন কোথায়! বেনজীর এখন কোথায়!

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এখন কোথায়? সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ের আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর আর প্রকাশ্যে তাকে দেখা যায়নি। গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। তবে এ তথ্যের সত্যতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইউএইয়ের আইন অনুযায়ী কারো বিচার চলাকালে তিনি দেশ ছেড়ে যেতে পারেন না। ফলে তার অবস্থান নিয়ে ধোয়াসা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তার অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। গত বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাটির কাছে ই-মেইল পাঠিয়ে বেনজীরের বর্তমান অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে।

 

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বুধবার একটি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে ইন্টারপোলের কাছে। তাতে আমরা সাবেক আইজিপি বেনজীরের অবস্থানের তথ্য জানতে চেয়েছি। কারণ অনেক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, তিনি অন্য কোথাও চলে গেছেন। ফলে আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইন্টারপোলের কাছে চিঠি দিয়েছি। উত্তর পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

 

 সেন্ট লুসিয়ায় চলে যাওয়ার খবর : গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই কারামুক্তির পর ১৭ আগস্ট দুবাই থেকে সেন্ট লুসিয়ায় যান বেনজীর আহমেদ। দেশটির পাসপোর্ট তার রয়েছে এবং সেখানে তার যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে বলেও ঐ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। সেন্ট লুসিয়ার গ্রোস আইসলেট এলাকায় তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথি ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্ত সাপেক্ষে তাকে জামিন দেন। সেখানে তাকে জামিনের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬ কোটি টাকা দিতে হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

দুবাইয়ের আদালত থেকে বেনজীরের জামিন ও কারামুক্তির খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তত্পরতা শুরু হয়। তাত্ক্ষণিকভাবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে ল’ ফার্ম নিয়োগ দেওয়ার কথা জানায়। সেই ল’ ফার্ম থেকেও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্র বলছে, বেনজীরের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি ল’ ফার্ম। ফলে ইন্টারপোলে চিঠি দেওয়া হয়েছে। 

ঢাকায় অবস্থানকারী বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ট এক ব্যক্তি ইত্তেফাককে বলেন, সর্বশেষ বেশ কিছুদিন আগে তার সঙ্গে বেনজীর আহমেদের যোগাযোগ হয়েছে। তখন তিনি দুবাইয়ে ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। এরপর অন্য কোথাও চলে গেছেন কি না, সে ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তবে সম্প্রতি তিনি বেনজীর আহমেদকে ম্যাসেজ দিলেও কোনো জবাব পাচ্ছেন না। ফলে তার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই।

 

ইউএই’র আইন কী বলে? : সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিন পেলেই কোনো বন্দি সাধারণত অন্য দেশে যেতে পারেন না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফৌজদারি কার্যবিধি আইন অনুযায়ী, জামিনে মুক্তির সাথে কিছু বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যা ঐ ব্যক্তিকে দেশত্যাগে বাধা দেয়। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা তদন্ত চলমান থাকলে এবং তিনি জামিন পেলে, তার ওপর সাধারণত একটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর ফলে দেশটির ইমিগ্রেশন ও বিমানবন্দরগুলোতে তার নাম ব্লক করে দেওয়া হয়, যাতে তিনি দেশত্যাগ করতে না পারেন। জামিন পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বন্দির পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে বা পাবলিক প্রসিকিউশনের কাছে জমা রাখা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল অভিযুক্তের পাসপোর্ট না থাকলে, তার জামিনদারের পাসপোর্ট বা আর্থিক গ্যারান্টি জমা রাখতে হয়। পাসপোর্ট ছাড়া অন্য কোনো দেশে ভ্রমণ করা আইনত অসম্ভব।

দুবাইয়ের বিচার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন তদন্ত বা ট্রায়ালের (বিচার প্রক্রিয়া) প্রতিটি শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত থাকেন। জামিন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, মামলাটি শেষ হয়ে গেছে, এর অর্থ হলো ব্যক্তিটি কারাগারের বাইরে থেকে আইনি লড়াই করতে পারবেন। মামলাটি পুরোপুরি নিষ্পত্তি (খালাস বা সাজা ভোগ) না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। যদি অত্যন্ত জরুরি কোনো মানবিক বা চিকিত্সার কারণে অন্য দেশে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে আদালতের কাছে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণসহ বিশেষ আবেদন করতে হয়। আদালত যদি সন্তুষ্ট হয়ে সাময়িকভাবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং পাসপোর্ট ফেরত দেয়, কেবল তখনই অন্য দেশে যাওয়া সম্ভব। তবে গুরুতর অপরাধ বা আর্থিক জালিয়াতির মামলায় এই অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। যদি কেউ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুবাই বা ইউএই থেকে পালানোর চেষ্টা করেন, তবে তার জামিন বাতিল করা হয়, জামিনদারের অর্থ বাজেয়াপ্ত হয় এবং তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে আদালতের সামনে হাজির করে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হয়

 

অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচারের অনুসন্ধান চলছে : বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগগুলোর তদন্তের অংশ হিসেবে দেশ-বিদেশে তার সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। তদন্ত চলাকালে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাতজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ঐ তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে দুদক আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সম্পদ জব্দের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীরের প্রত্যার্পণ চায়। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রস্তুত করা প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে দেশে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য ও প্রত্যার্পণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়।

 

 



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ