ঢাকা , শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ , ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৪ চিকিৎসক পদের ২০টিই শূন্য, ঝুঁ'কি'পূ'র্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-২৯ ১২:১৬:৩৭
৩৪ চিকিৎসক পদের ২০টিই শূন্য, ঝুঁ'কি'পূ'র্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা ৩৪ চিকিৎসক পদের ২০টিই শূন্য, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক
জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চিকিৎসকের তীব্র সংকট, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ প্যাথলজি কার্যক্রম ও জটিল অস্ত্রোপচার। এর সঙ্গে আধুনিক ডিজিটাল এক্সরে মেশিন থাকলেও সেটি পড়ে আছে বাক্সবন্দি অবস্থায়। অবকাঠামো ও জনবল সংকটে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। প্রতিদিন শত শত রোগী হাসপাতালে এলেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে কচুয়া ও আশপাশের এলাকার মানুষকে যেতে হচ্ছে বাগেরহাট সদর হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে। এতে বাড়ছে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়, সময় ও ভোগান্তি।

 

সরেজমিনে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, গণপূর্ত বিভাগ ঘোষিত ৩১ শয্যার একটি পরিত্যক্ত ভবনেই জরুরি বিভাগ, স্বাস্থ্য সহকারীদের কার্যালয়, টিকাদান কার্যক্রম, সেবিকা কক্ষ এবং ভর্তি রোগীদের জন্য চারটি শয্যাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। কোথাও কোথাও ছাদের রড বের হয়ে গেছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। আতঙ্কে রয়েছেন রোগী ও স্বজনরাও।

 

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০০৫ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৪টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। নিয়মিত হাসপাতালে থাকেন প্রায় ১০ জন। ফলে ২০টি চিকিৎসক পদই শূন্য। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।হাসপাতালে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো জটিল অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। বর্তমানে কেবল ছোটখাটো অস্ত্রোপচার—কাটা-ছেঁড়া, ফোঁড়া ইত্যাদির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ। প্যাথলজিস্টের পদ থাকলেও টেকনোলজিস্ট না থাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এক্সরে বিভাগেও রয়েছে অব্যবস্থাপনার চিত্র। হাসপাতালের পুরোনো এক্সরে মেশিনটি চালু থাকলেও এটি ১৯৭২ সালের পুরোনো প্রযুক্তির। অন্যদিকে প্রায় নয় মাস ধরে হাসপাতালে পড়ে আছে আধুনিক ডিজিটাল এক্সরে মেশিন। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ও আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা না হওয়ায় এখনো সেটি বাক্সবন্দি।

 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ডিজিটাল এক্সরে মেশিনটি চালাতে প্রায় ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অথচ পুরো হাসপাতাল বর্তমানে মাত্র ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সংযোগে চলছে। মেশিন স্থাপনের জন্য প্রয়োজন আলাদা কক্ষও। এসব বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো এক্সরে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাফি মেশিন সচল থাকলেও নতুন ডিজিটাল এক্সরে মেশিনটি অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ৬৭টি। এর বাইরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন ছয়জন। তবে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা নাজমুল আহমেদ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ডাক্তার কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার অনেক সেবা এখানে পাওয়া যায় না। ভবনের অবস্থাও খুব খারাপ, কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে, আবার কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে রোগী হিসেবে সবসময় ভয় লাগে। আমরা চাই, সরকার দ্রুত হাসপাতালের ভবন সংস্কার করে প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স ও জনবল নিয়োগ দিক এবং সব ধরনের চিকিৎসাসেবা চালু করুক।

 

হাসপাতালে ভর্তি এক নারী রোগীর স্বজন মোঃ অয়ন বলেন,একটি ভবন পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় নারী-পুরুষ সবাইকে একই জায়গায় থাকতে হচ্ছে। শয্যা সংকটের কারণে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে। দিন-রাত সবাইকে এক জায়গাতেই থাকতে হয়। নারীদের জন্য এটি খুবই বিড়ম্বনার। বিভিন্ন জায়গা থেকে ভবনের অংশ ভেঙে পড়ছে। ছাদের বিভিন্ন স্থানে রড বের হয়ে আছে। পর্যাপ্ত শয্যা, ফ্যান ও বাথরুমেরও সংকট রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

 

কচুয়ার স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মল্লিক বলেন, উপজেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু এখানে এসে অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পাওয়া যায় না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চিকিৎসক সংকট ও বিভিন্ন সেবা বন্ধ থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বাগেরহাট শহর কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও টাকা দুটোই বেশি খরচ হচ্ছে। দ্রুত হাসপাতালের অবকাঠামো সংস্কার, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং বন্ধ সেবাগুলো চালু করা দরকার।

 

হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক শেখ আসাদুজ্জামান বলেন, আমি দীর্ঘদিন সরকারি কোয়ার্টারে ছিলাম। কিন্তু ভবনটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বসবাসের উপযোগী না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে থাকছি। এখনো কিছু কর্মচারী সেখানে বসবাস করছেন। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, হাসপাতালের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

 

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মুশফিকুর রহমান তরফদার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে বসেই আমাদের সেবা দিতে হচ্ছে। ভবনের কয়েকটি জায়গায় বড় বড় ফাটল ধরেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সেবা দিচ্ছি। ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। জরুরি বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন ৩০০-এর বেশি রোগী আসে।

 

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকের অনুমোদিত ৩৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১৪ জন কর্মরত আছেন। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ বলেন,হাসপাতালের পুরোনো এক্সরে মেশিন দিয়ে ঠিকমতো এক্সরে করা যায় না। নতুন যে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন দেওয়া হয়েছে, সেটি চালাতে ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অথচ পুরো হাসপাতাল চলছে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুতে। এ ছাড়া মেশিনটির জন্য আলাদা কক্ষও প্রয়োজন। এসব চাহিদার কথা জানিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হয়নি।

 

তিনি আরও বলেন, পরিত্যক্ত ভবনসহ হাসপাতালের বিভিন্ন সংকটের বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা আশা করছি, দ্রুত এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ