ঢাকা , শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ , ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই ওসির হানি ট্র্যাপে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-২২ ১০:৩৪:৪৪
দুই ওসির হানি ট্র্যাপে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা দুই ওসির হানি ট্র্যাপে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা


নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজকে হানি ট্র্যাপে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রতারণা চক্রের হোতা জুবাইরুল হক জিয়ান (৩১) বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে নিজের কণ্ঠস্বর নারী কণ্ঠে রূপান্তর করে টার্গেটেড ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতেন। আর এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে সিএমপির দুই ওসির বিরুদ্ধে। কমিশনারকে ফাঁদে ফেলে তারা দেড় বছর বিভিন্ন থানার পদায়ন-বদলি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।

 

তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সিএমপির দুই ওসি বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলাম। জাহেদুল বর্তমানে পাঁচলাইশ থানায় এবং বাবুল আজাদ ডিবি (দক্ষিণ) বিভাগে কর্মরত। কমিশনার হাসিবের দায়িত্বকালে বাবুল পাহাড়তলী, ডবলমুরিং ও চকবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

কমিশনারের ব্যক্তিগত ভিডিও হাতে পাওয়ার পর দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে এই চক্রটি সিএমপির ১৬টি থানার পদায়ন-বদলি কার্যত নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে অভিযোগ। বিষয়টি দীর্ঘদিন সিএমপিতে ওপেন সিক্রেট থাকলেও কমিশনারের আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঝুঁকির কারণে কেউ মুখ খোলেননি। হাসিব চট্টগ্রাম ছাড়ার পর একটি গোয়েন্দা টিম প্রতারক জিয়ানকে আটক করে তার মোবাইল ফোন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সেখান থেকেই সাবেক কমিশনার হাসিব, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী বিপ্লব বড়ুয়াসহ একাধিক শিল্পপতির ব্যক্তিগত আপত্তিকর ভিডিও উদ্ধার করা হয়।

 

জিয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদকারী একাধিক কর্মকর্তার তথ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে টার্গেট করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেন জিয়ান। পরে তা হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সম্প্রসারিত হতো। এই প্রতারণা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল বলে অভিযোগ। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাহাড়তলী থানার তৎকালীন ওসি বাবুলের সঙ্গে জিয়ানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে বাবুলের মাধ্যমেই তার ব্যাচমেট ওসি জাহেদুলের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর তিনজন মিলে পরিকল্পনা করেন তৎকালীন কমিশনার হাসিবকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার।  সিএমপির সাবেক কমিশনার এবং বর্তমানে এপিবিএনপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ হানিট্র্যাপে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পরিচয়টি ভুয়া জানতে পেরে যোগাযোগ বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে ওই প্রতারক তাকে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করাতে পারেনি বলেও দাবি করেন হাসিব। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানান তিনি।

 

যেভাবে ফাঁদে সাবেক কমিশনার

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের মডেল সানজিদা ইসলাম সায়মার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান তৎকালীন পাহাড়তলী থানার ওসি বাবুল। পরে নিজের শ্যালিকা পরিচয়ে সায়মাকে কমিশনার হাসিবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেই রাতেই ‘সানজিদা ইসলাম সায়মা’ নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলেন প্রতারক জিয়ান। এই আইডি থেকে কমিশনারকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। অনুরোধ গৃহীত হওয়ার পর শুরু হয় কথোপকথন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চলে তাদের চ্যাট এবং অডিও-ভিডিওকলে কথা।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কমিশনার হাসিবের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত প্রতারকচক্রের তিনটি মোবাইল নম্বর এবং চারটি ভিডিওর সন্ধান মিলেছে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ফেসবুকে সায়মার একটি লাইভ ভিডিও থেকে ১৫ সেকেন্ডের একটি অংশ কেটে ভিডিওকলের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ভিডিওকলের অপর প্রান্তে থাকা নারী তখন সত্যিই ক্যামেরার সামনে ছিলেন কি না। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তিনি ছিলেন না; বরং ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে সায়মার আগের ভিডিও পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছিল।

হাসিবের সঙ্গে কথিত ওই নারী পরিচয়ের যোগাযোগ স্থায়ী হয় ২০২৫ সালের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। চারটি ভিডিওর একটিতে হাসিবকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়; বাকি তিনটিতেও রয়েছে ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য। এর মধ্যে তিনটি ভিডিও নিজের বলে স্বীকার করেছেন হাসিব। তবে একটি ভিডিও সম্পর্কে তার দাবি, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। অল্প সময়ের মধ্যেই তার ব্যক্তিগত ভিডিও প্রতারকচক্রের হাতে চলে যায়। একপর্যায়ে প্রতারণার ফাঁদে পড়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন হাসিব।

 

থানা নিয়ন্ত্রণে দুই ওসি

সংগৃহীত ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সিএমপির ১৬টি থানা নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে দুই ওসি বাবুল ও জাহেদুলের বিরুদ্ধে। কোন থানায় কোন ওসিকে পোস্টিং দেওয়া হবে, কোন থানা থেকে কাকে সরানো হবেÑএসবের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছিল বলে অভিযোগ। দেনদরবার চূড়ান্ত করে জিয়ানকে দিয়ে ফোন করিয়ে হাসিবের কাছ থেকে অফিস আদেশ আদায় করে নেওয়া হতো বলে জানা গেছে। সিএমপিতে বিষয়টি তখন থেকেই ওপেন সিক্রেট থাকলেও ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পাননি।

বিষয়টি জানতে পারেন প্রকৃত সানজিদা ইসলাম সায়মাও। তার নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে সাবেক কমিশনারকে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত প্রতারককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

পদোন্নতি পেয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) যোগ দিয়ে হাসিব আজিজ চট্টগ্রাম ছাড়ার পর একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, শুধু হাসিব আজিজই নন, প্রায় এক দশক ধরে এমন কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে জিয়ানের বিরুদ্ধে। কখনো চট্টগ্রাম, কখনো সাতকানিয়া বা বান্দরবানের পরিচিত পরিবারের নারী হিসেবে, আবার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজেকে ডিভোর্সি ও এক সন্তানের মা হিসেবে উপস্থাপন করতেন তিনি। এসব ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চট্টগ্রামের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়েছিল বলে তথ্য মিলেছে। প্রভাবশালীদের অন্তরঙ্গ ভিডিও হাতে থাকায় জিয়ান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে অভিযোগ। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সাবেক কমিশনারকে কাজে লাগিয়ে এবং প্রভাবশালী লোকদের ব্ল্যাকমেইল করে জিয়ান-চক্র ওই দেড় বছরে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে ‘জান্নাতুল মনি’ নামের আরেকটি পরিচয়ও উঠে এসেছে, যাকে কথিতভাবে জিয়ানের বোন হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এছাড়া ‘জান্নাতুল নাইমা’ নামে আরেকটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পুলিশের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যবহার নিয়ে। তথ্যমতে, ওসি বাবুলের ‘শ্যালক’ পরিচয়ে সিএমপির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন জিয়ান এবং সেই সম্পর্ক ব্যবহার করে মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাঁচলাইশ থানার ওসি জাহেদুলের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে।

 

শিল্পপতির মেয়ে সাজিয়ে প্রতারণা

তদন্তে জিয়ানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৪টি নারী-পরিচয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে ২০২০ সালেও একবার তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় শিল্প প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে, পাশাপাশি ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখিয়ে অর্থ দাবিরও অভিযোগ ছিল। ২০২০ সালের ২৯ মে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে; তখন তিনটি মোবাইল ফোন এবং পাঁচটি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে চক্রের হোতা থাকা জিয়ান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সানজিদা নামে কাউকে চিনি না। আমি এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, এই প্রতারকের বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে অভিযানে নেমেছেন। শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, বিষয়টি তার জানা নেই এবং সাবেক পুলিশ কমিশনারও এ ধরনের কোনো অভিযোগ লিখিত বা মৌখিকভাবে তাকে জানাননি। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে দেন, আমি ব্যবস্থা নেব।’



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ