৫ই অগাস্ট প্রকাশের জন্য 'চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি: বাংলাদেশের ইতিহাসের অনন্য মাইলফলক' শিরোনামের নিবন্ধ
৫ই অগাস্ট প্রকাশের জন্য 'চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি: বাংলাদেশের ইতিহাসের অনন্য মাইলফলক' শিরোনামের নিবন্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক
চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি: বাংলাদেশের ইতিহাসের অনন্য মাইলফলক ড. মাহরুফ চৌধুরী ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা। ইতিহাস কখনো স্থির নয়; এটি অবিরাম পরিবর্তন, অভিযোজন ও পুনর্গঠনের এক চলমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। কোনো জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করে একটি জাতির অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে।
পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর। পলাশী-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭-পূর্ব ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম, তারপর ১৯৭৪-উত্তর ভাষার জন্য সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণের তথা স্বাধিকারের সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- এর সবকিছু মিলিয়েই আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে। এ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে; ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করেছে; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান গণশক্তির সক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে; আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিণতি দিয়েছে। নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং নির্ধারক মাইলফলক, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা জাতির ইতিহাসের পথচলা কোনো একক ঘটনার মধ্যেই থেমে থাকে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার পরাজয় যেমন এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল এবং তার অভিঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়, কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনো জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসক শ্রেণীর যাতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে। এই কারণেই স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। একটি জাতির ইতিহাসের ক্রমধারায় নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, এবং তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। ফলে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা তথা মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রভৃতি বিষয় প্রতিটি যুগে নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের দাবি তোলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। তাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স