রাজাপুরে খাল পুনঃখননে ফিরছে কৃষিজমির প্রাণ উপকৃত হবেন ২৪ হাজারের বেশি মানুষ, কমবে জলাবদ্ধতা, বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদন
রাজাপুরে খাল পুনঃখননে ফিরছে কৃষিজমির প্রাণ উপকৃত হবেন ২৪ হাজারের বেশি মানুষ, কমবে জলাবদ্ধতা, বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদন
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজাপুরে খাল পুনঃখননে ফিরছে কৃষিজমির প্রাণ উপকৃত হবেন ২৪ হাজারের বেশি মানুষ, কমবে জলাবদ্ধতা, বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদন মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:- এক সময় ভরাট হয়ে পড়েছিল খাল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। বর্ষায় জলাবদ্ধতায় নষ্ট হতো ফসল, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত তীব্র সেচ সংকট। দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগ কাটিয়ে এখন নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা। বিভিন্ন খাল পুনঃখননের ফলে ফিরছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। এতে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি সরাসরি উপকৃত হবেন ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ। দীর্ঘদিন অবহেলা, ময়লা-আবর্জনা ও পলি জমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খাল ভরাট হয়ে পড়েছিল। ফলে বর্ষায় সৃষ্টি হতো জলাবদ্ধতা এবং শুকনো মৌসুমে দেখা দিত সেচ সংকট।
এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়তেন কৃষক ও সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় সরকারের 'সারা দেশের পুকুর-খাল উন্নয়ন' (আইপিসিপি) এবং 'জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা' প্রকল্পের আওতায় উপজেলার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়নের ধানসিঁড়ি নদী থেকে পিংড়ি হয়ে কাঠাখালী পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এতে উপকৃত হবেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। সাতুরিয়া ইউনিয়নের উত্তর তারাবুনিয়া এলাকার ৮০০ মিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। এর সুফল পাবেন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষ। রাজাপুর সদর ইউনিয়নের মরিচবুনিয়া খালের ১ হাজার ২০০ মিটার পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এতে উপকৃত হবেন প্রায় ১২ হাজার ৫০ জন। তুলাতলি এলাকার ২ হাজার ৯০০ মিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর সুফল পাবেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ। এছাড়া রাড়িবাড়ি খালের ১ হাজার ২০০ মিটার পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১৪ লাখ ৫ হাজার টাকা।
এতে উপকৃত হবেন আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ। সব মিলিয়ে পাঁচটি প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ। খাল পুনঃখননের সুফল শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়। পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ায় দেশীয় মাছের আবাসস্থল তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পানির সংকটে থাকা মানুষ এখন সহজেই দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহার করতে পারছেন। পাশাপাশি খালের দুই পাড় দিয়ে চলাচলের সুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছে। স্থানীয় কৃষক রিপন সিকদার, কাদের সিকদার, করিম তাদের ভাষ্য, আগে খালে পানি না থাকায় জমিতে সেচ দিতে চরম ভোগান্তি হতো। এখন সহজেই পানি পাওয়া যাবে। এতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়বে বলে তারা আশা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শিখারানি, মনিকা রায়, শেফালি বেগম জানান, খাল ভরাট থাকায় রান্না, গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে পানির সংকট ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। খাল পুনঃখননের ফলে সেই দুর্ভোগ অনেকটাই দূর হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বৃদ্ধি পায়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয় এবং দেশীয় মাছের আবাসস্থল তৈরি হয়। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা কমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু খাল পুনঃখনন করলেই হবে না; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আবারও খাল ভরাট হয়ে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খালগুলো খনন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তিনি জানান, আইপিসিপি এবং জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল প্রকল্পের আওতায় ধানসিঁড়ি-পিংড়ি-কাঠাখালী, উত্তর তারাবুনিয়া, তুলাতলি, রাড়িবাড়ি ও মরিচবুনিয়া খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একসময় যে খাল ছিল দুর্ভোগের প্রতীক, পুনঃখননের পর সেই খালই এখন হয়ে উঠছে কৃষক ও সাধারণ মানুষের আশার প্রতীক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে রাজাপুরের এই খালগুলো দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তথ্যছক (বক্স) রাজাপুরে পুনঃখনন করা পাঁচ খাল ধানসিঁড়ি-পিংড়ি-কাঠাখালী খাল — ৭ কিমি — ব্যয় ১.২৫ কোটি টাকা — উপকারভোগী ৫,০০০ জন উত্তর তারাবুনিয়া খাল — ৮০০ মিটার — ব্যয় ১৬ লাখ টাকা — উপকারভোগী ৩,৫০০ জন মরিচবুনিয়া খাল — ১,২০০ মিটার — ব্যয় ১৪.১৩ লাখ টাকা — উপকারভোগী ১২,০৫০ জন তুলাতলি খাল — ২,৯০০ মিটার — ব্যয় ৩৪.৪০ লাখ টাকা — উপকারভোগী ২,৫০০ জন রাড়িবাড়ি খাল — ১,২০০ মিটার — ব্যয় ১৪.০৫ লাখ টাকা — উপকারভোগী ১,৪০০ জন মোট উপকারভোগী: ২৪ হাজারের বেশি মানুষ। মো. নাঈম হাসান ঈমন ঝালকাঠি প্রতিনিধি: মোবাইল ০১৭৪৭-৯৮৬৩৫৮ /০১৭৫৬-৫৫৫৩২১ তারিখ: ২১জুলাই ২০২৬
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স