মামলার নথি পাঠিয়ে ৪০ হাজার টাকা দাবি, লেনদেন হয় বিকাশে
আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, পুলিশ পরিচয়ে টাকা নিয়েও মামলার আসামি যুবলীগ নেতা
আপডেট সময় :
২০২৬-০৭-২০ ২০:৪০:৩৯
আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, পুলিশ পরিচয়ে টাকা নিয়েও মামলার আসামি যুবলীগ নেতা
রাহাদ সুমন, বরিশাল ব্যুরো :
দেশব্যাপী আলোচিত বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনায় মামলায় আসামি করা হয়েছে দুইজন সাংবাদিক নেতাকে। এ নিয়ে যখন সাংবাদিক মহল থেকে শুরু করে সর্বস্তরে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই নতুন করে সামনে এসেছে মামলা বানিজ্যের অভিযোগ।
মামলায় আসামি করা হবে না জানিয়ে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরবর্তীতে বিকাশের মাধ্যমে ১৯ হাজার টাকা নিয়েও আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এক যুবলীগ নেতাকে। একই মামলায় আরো একজন যুবলীগ নেতাকে আসামি করা হয়। বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের কিছু প্রমাণও এসেছে সাংবাদিকদের কাছে।
থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) নাম ব্যবহার করে, হামলা-ভাঙচুরের মামলার বাদি উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুকের পরিচয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ওই টাকা। তবে লেনদেন এবং যেই নম্বর থেকে ফোন করে টাকা দাবি এবং বিকাশে লেনদেন করা হয়েছে দুটি নম্বরই এখন বন্ধ রয়েছে। আর পুলিশ বলছে, বন্ধ থাকা নম্বর দুটি নীলফামারি এলাকার বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্রমতে, গত ৯ জুলাই মাদক ও চুরি মামলায় গ্রেপ্তারকৃত সন্ধিগ্ধ আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে প্রকাশ্যে মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা-ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধর করে থানার পাশ্ববর্তী ফুলশ্রী গ্রামের বাসিন্দা গ্রেপ্তারকৃত রিয়াজ ফকিরের স্বজনরা। পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্বেও এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এফএম নাজমুল রিপন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাত ও জেলা যুবলীগ নেতা মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাতকে উস্কানিদাতা হিসেবে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ৪৩ জনের নামোল্লেক করে আরও প্রায় তিনশ' জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।
আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক বাদি হয়ে দায়ের করা মামলায় ২৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বরিশাল জেলা যুবলীগের সদস্য উপজেলার সেরাল গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাতকে।
আগৈলঝাড়া উপজেলার সেরাল গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাত অভিযোগ করে বলেন, থানায় ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার মামলায় আমাকে উদ্দেশ্যেমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। থানায় মামলার আবেদন জমা দেওয়ার পর ওসি স্বাক্ষর দেওয়ার আগেই (০১৯৮৭-২৯৩৪৮৬) নম্বর থেকে আমার কাছে ৯ জুলাই ফোন আসে।
তখন মোবাইল ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি নিজেকে মামলার বাদী এবং আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক পরিচয় দিয়ে জানায় মামলায় আমাকেও আসামি করা হচ্ছে। তাই নাম কাটাতে হলে ১০ মিনিটের মধ্যে ৪০ হাজার টাকা পুলিশ পরিদর্শকের (তদন্ত) কাছে পাঠাতে হবে।
সাগর সেরনিয়াবাত বলেন, আমি বিষয়টিকে প্রথমে প্রতারণা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস অর্জনের জন্য পরবর্তীতে (০১৭৮৬-৫৪১০২৭) নম্বর থেকে আমাকে কল দিয়ে ওসি তদন্ত পরিচয় দেয় এবং আমার সাথে কথা বলেন। এমনকি আমার সন্দেহ দূর করার জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম মারুফ ও সাবেক ইউপি সদস্য বাদল সেরনিয়াবাতের মোবাইল ফোন করে কনফারেন্সে আমার সাথে কথা বলেন।
সাগর সেরনিয়াবাত আরও অভিযোগ করেন, এসআই এবং ওসি তদন্তের পরিচয় সনাক্তের পর শুরু হয় দরকষাকষি। মামলা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে ১৯ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। এরপর (০১৭৮৬-৫৪১০২৭) নাম্বারে দুইবারে ১৫ হাজার ৫ টাকা এবং ৪ হাজার ৫ টাকা করে মোট ১৯ হাজার ১০ টাকা পাঠানো হয়।
তিনি (সাগর) বলেন, গত ১০ জুলাই মামলাটি থানায় এজাহারভুক্ত হওয়ার পর জানতে পারি আমাকে এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাতকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। পরে টাকা পাঠানোর নম্বরে যোগাযোন করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
সাগর সেরনিয়াবাত অভিযোগ করে বলেন, এজাহারে ওসির স্বাক্ষর হওয়ার পূর্বে সেই অভিযোগের কপি পুলিশ সদস্য ছাড়া বাহিরের কারো জানার কথা নয়। আমার ধারনা মামলার বাদি এবং ওসি তদন্ত এই কান্ডের সাথে জড়িত। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ বিচার দাবি করছি। তিনি আরও বলেন, থানায় ভাঙচুরের ঘটনার সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে প্রশাসন যে শাস্তি দিবে আমি তা মাথা পেতে নেবো।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার বাদী আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ প্রতারণা করতে পারে। ওই ব্যক্তির (সাগর) সাথে অদ্যবধি আমার কোন কথা হয়নি।
অপরদিকে ইউপি সদস্য মারুফ সেরনিয়াবাত বলেন, সাগর আমার ভাগ্নে। থানার ওসি আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলো সাগর থানা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত। আমি তাকে বলেছি ঘটনার সময় সাগর আমার সাথেই ছিল। এরপর ওসি ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এর কিছুক্ষণ পরে আবার ওসি ফোন করে জানতে চান কে কে আমার এলাকা থেকে থানায় ভাঙচুর করতে গিয়েছিল। আমি তাদের বলেছি এখান থেকে কেউ যায়নি। আপনারা ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। এছাড়া লেনদেনের বিষয়ে কোন আলোচনা হয়নি। তাছাড়া সাগর আলাদাভাবে যদি লেনদেন করে থাকে সেটা আমার জানা নেই বা সে আমাকে জানায়নি।
সাবেক ইউপি সদস্য বাদল সেরনিয়াবাত বলেন, এমন কোন ঘটনার সাক্ষী আমি না। এ বিষয় নিয়ে আমার সাথে পুলিশ বা আসামি কারোর সাথেই কোন আলোচনা হয়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ মাসুদ খানকে তার সরকারি মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোন ধরনের বক্তব্য নেয়া যায়নি।
তবে আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুশংকর মল্লিক বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আমি জেনেছি। যেই নম্বর থেকে লেনদেন এবং যোগাযোগ করা হয়েছে সেই নাম্বার দুটি আমরা ট্রেস করেছি। নাম্বার দুটির লোকেশন নীলফামারি দেখা গেছে। তবে দুটি নাম্বারই বন্ধ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, হতে পারে প্রতারকরা আমাদের নাম ব্যবহার করে এমন কাজ করেছে। তবে এজাহারভুক্ত হওয়ার আগে মামলার আবেদন বাহিরে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্নে ওসি তদন্ত বলেন, মামলা আদালতে যাওয়ার আগপর্যন্ত নথি বাহিরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কিভাবে যে এটা হলো তা বুঝতে পারছি না।
অপরদিকে যুবলীগ নেতার কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারটি কার বা কোথা থেকে সিম দুটি ক্রয় করা হয়েছে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একটি ট্রু কলার মোবাইল অ্যাপে নাম্বারটি সার্চ দিলে সেখানে ‘এসআই চরফ্যাশন’ লেখা আসে।
তবে এমন ঘটনা জানা নেই দাবি করে বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এমন কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। যিনি এমন অভিযোগ করেছেন তাকে আমার কাছে অথবা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
উল্লেখ্য, দেশব্যাপী আলোচিত এ মামলায় ইতোমধ্যে পুলিশ এজাহারভূক্ত প্রধান আসামিসহ ২৯ জন নারী-পুরুষ আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin
কমেন্ট বক্স