প্রতিকূল আবহাওয়াতেও সফল বারোমাসি তরমুজের চাষাবাদ
প্রতিকূল আবহাওয়াতেও সফল বারোমাসি তরমুজের চাষাবাদ
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কুড়িগ্রামের কৃষকরা। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তারা এখন জলবায়ু অভিযোজন পদ্ধতিতে বারোমাসি তরমুজ চাষে সফলতা পাচ্ছেন। এতে জলবায়ুজনিত ক্ষতি কমার পাশাপাশি বাড়ছে কৃষকদের আয়ও।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের ঝাড়খোলা গ্রামের কৃষক জামান মিয়া ২৫ শতক জমিতে পলিটানেল পদ্ধতিতে সাড়ে ৩ শতাধিক বারোমাসি তরমুজের চারা রোপণ করেছেন। জমির চারপাশে নাইলনের জালের বেড়া, পলিথিনের সুড়ঙ্গাকৃতির পলিটানেল, বাঁশ ও জিআই তারের মাচা এবং ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করছেন তিনি। যা কৃষিতে গ্রিনহাউসের মতো কাজ করে। এটি ফসলকে অতিরিক্ত ঠান্ডা, অতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রাসহ ক্ষতিকারক পোকামাকড় এবং পাখির আক্রমণ থেকে গাছ ও ফল রক্ষা করে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, পলিটানেল প্রযুক্তি অতিবৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, শীত, পোকামাকড় ও পাখির আক্রমণ থেকে গাছকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ছত্রাকজনিত রোগের প্রকোপ কমায়, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং সেচের পানির অপচয়ও কম হয়। ফলে কম খরচে উন্নতমানের ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের খালিশা কালোয়া গ্রামের কৃষক মোঃ জিয়াউর রহমান ১৫ শতক জমিতে ৩০০টির বেশি বারোমাসি তরমুজের চাষ করেছেন। ছোট আকারের, ডিম্বাকার ও কালো খোসার এসব তরমুজের ভেতরটি টকটকে লাল। অমৌসুমে উৎপাদিত হওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন চাষিরা। ফলে জেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বারোমাসি তরমুজ চাষ।
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগ জানায়, বর্তমানে হাইব্রিড, চায়না, থাইল্যান্ড, সুইট বেবি ও সুইট কর্নসহ কয়েকটি জাতের বারোমাসি তরমুজের বীজ দেশে পাওয়া যাচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এসব জাতের চারা রোপণ করা যায়। বারোমাসি তরমুজের এসব জাত বছরের যেকোনো সময় চাষ করা যায়। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। প্রতি বিঘা জমিতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০টি চারা রোপণ করা সম্ভব।
এছাড়াও বারোমাসি তরমুজ চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ২০০ কেজি জৈব সার বা ভার্মি কম্পোস্ট, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ৪০ কেজি টিএসপি, ৪০ কেজি এমওপি, ২০ কেজি জিপসাম, ১ কেজি জিংক সালফেট এবং দেড় কেজি বোরণ সার ব্যবহার করা হয়। বেড তৈরির সময় এসব সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়।
কৃষক মোঃ গোলজার বলেন, মে মাসের শুরুতে তরমুজের চারা রোপণ করেছি। বাঁশের মাচা, সার ও শ্রমিকসহ প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রথম দফায় ৭০টি তরমুজ বিক্রি করেছি। সামনে আরও ২ দফা ফলন পাওয়া যাবে। একই জমিতে বছরে ৩ বার তরমুজ এবং একবার সবজি চাষ করা সম্ভব হওয়ায় ভালো লাভ হচ্ছে।
কৃষক মোঃ জামান মিয়া বলেন, অনিয়মিত বৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আগের মতো চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই প্রথমবারের মতো পলিটানেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তরমুজ চাষ করছি। এতে ফসল সুরক্ষিত থাকছে এবং উৎপাদনও ভালো হচ্ছে।
কৃষাণী মোছাঃ জেসমিন আরা ও মোছাঃ খাদিজা বলেন, বারোমাসি তরমুজ চাষের মাধ্যমে কৃষকরা বছরে ৩-৪ বার ফসল উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।
আরডিআরএস বাংলাদেশের রংপুর বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের জমি সারা বছর উৎপাদনমুখী রাখতে আরডিআরএস ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, জেলার সদর, রাজারহাট, ভূরুঙ্গামারী ও উলিপুর উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩৫ একর জমিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ হয়েছে। লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স