ঢাকা , বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ , ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তদন্ত ঠেকাতে আদালতে মামলা, মির্জাগঞ্জের দরগাহ শরীফ বিদ্যালয় ঘিরে চাঞ্চল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-১৩ ১৯:০৭:৪০
তদন্ত ঠেকাতে আদালতে মামলা, মির্জাগঞ্জের দরগাহ শরীফ বিদ্যালয় ঘিরে চাঞ্চল্য তদন্ত ঠেকাতে আদালতে মামলা, মির্জাগঞ্জের দরগাহ শরীফ বিদ্যালয় ঘিরে চাঞ্চল্য
 
নিজস্ব প্রতিবেদক
 
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন দরগাহ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, জাল সনদ, নাবালিকা শিক্ষার্থীকে বিয়ে এবং সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগের পর জেলা শিক্ষা অফিস তদন্তের নির্দেশ দেয়। তবে নির্ধারিত তদন্তের আগেই অভিযুক্ত এক শিক্ষিকা আদালতে মামলা করে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন জানানোয় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, প্রশাসনিক তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করতেই আদালতের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মামলার বাদী শিক্ষিকা অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক বলে আদালতে দাবি করেছেন।
 
জানা গেছে, দ্য কান্ট্রি টুডে পত্রিকার পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি মো. মনজুর মোর্শেদ তুহিন গত ৬ জুলাই ২০২৬ জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
 
অভিযোগে বলা হয়, বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক মো. সোহেলের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের এক নাবালিকা শিক্ষার্থীকে বিয়ে করে একসঙ্গে বসবাসের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হিন্দু ধর্মের শিক্ষিকা ছবি রানী খাসকেলের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই অভিযোগকারী অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকার সনদ বৈধ বলে মতামত দেওয়া হয়।
 
একই অভিযোগপত্রে সাংবাদিক দাবি করেন, গত ৫ জুলাই অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বিদ্যালয়ে গেলে ছবি রানী খাসকেলের উপস্থিতিতে সহকারী শিক্ষক মো. সোহেল ও ইংরেজি শিক্ষক বিল্লাল হোসেন রাজুর প্ররোচনায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. জলিল গোলদার তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ ঘটনার ভিডিও ও বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
 
এছাড়া মো. জলিল গোলদারের বিরুদ্ধে অষ্টম শ্রেণির জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদানের অভিযোগও আনা হয়। অভিযোগকারী দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবর্ষের বিদ্যালয়ের নথিতে ওই নামে কোনো শিক্ষার্থীর তথ্য পাওয়া যায়নি।
 
অভিযোগ পাওয়ার পর ৮ জুলাই ২০২৬ জেলা শিক্ষা অফিসার মুহা. মুজিবুর রহমান বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী পরিদর্শক মো. আবু হানিফ ও গবেষণা কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী খানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
 
এরপর ৯ জুলাই জেলা শিক্ষা অফিস থেকে আরেকটি চিঠি দিয়ে জানানো হয়, ১৩ জুলাই সকাল ১০টায় বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্ত অনুষ্ঠিত হবে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
 
কিন্তু তদন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই অভিযুক্ত শিক্ষিকা ছবি রানী খাসকেল মির্জাগঞ্জ সিভিল জজ আদালতে মোকদ্দমা নং-৬৫/২০২৬ দায়ের করেন। মামলায় তিনি জেলা শিক্ষা অফিসের ৮ জুলাইয়ের তদন্ত নির্দেশ (স্মারক-৫৩২) এবং ৯ জুলাইয়ের তদন্ত সহায়তা সংক্রান্ত চিঠি (স্মারক-৫৪২)-এর কার্যক্রম স্থগিত (Stay) রাখার আবেদন জানান।
 
এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের উদ্দেশে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে জানতে চান, কেন তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হবে না। আদালতের নোটিশে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
 
মামলার আবেদনে ছবি রানী খাসকেল দাবি করেন, তিনি ২০০৩ সালে বিধি অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত হন, পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় কোর্স সম্পন্ন করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আরও দাবি করেন, পূর্বে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস তদন্ত করে তার শিক্ষাগত সনদের সত্যতা পেয়েছে এবং শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন অডিটেও কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। তাই নতুন তদন্তের উদ্যোগ তাকে হয়রানি ও চাকরিচ্যুত করার অপচেষ্টা।
 
এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসার মুহা. মুজিবুর রহমান বলেন, "অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিধি অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৩ জুলাই সরেজমিন তদন্তের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ছবি রানী খাসকেল আদালতের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়ে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছেন। আদালতে যথাযথ জবাব দেওয়া হবে এবং আদালতের নির্দেশনা ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।"
 
এ ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হওয়া জরুরি। অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষিকা আদালতের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ফলে এখন প্রশাসনিক তদন্তের ভবিষ্যৎ ও আদালতের পরবর্তী আদেশের দিকেই সবার নজর।
 
উল্লেখ্য, অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশিত হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াধীন।

 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ