ঢাকা , শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ , ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবুজ পরিবেশ, সতেজ আবহাওয়া-আতিকুর রহমান নগরী

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-১০ ১৫:১৮:০৪
সবুজ পরিবেশ, সতেজ আবহাওয়া-আতিকুর রহমান নগরী সবুজ পরিবেশ, সতেজ আবহাওয়া-আতিকুর রহমান নগরী
নিজস্ব প্রতিবেদক



ইসলামে বৃক্ষরোপ সবুজ পরিবেশ, সতেজ আবহাওয়া আতিকুর রহমান নগরী গাছপালা-তরুলতা আল্লাহ তায়ালার এক বড় নেয়ামত। প্রকৃতির অপূর্ব শোভা বর্ধিত করে গাছপালা। বৃক্ষহীন পৃথিবীটা মলিনের মতো। বৃক্ষের অস্তিত্বে প্রাণের অস্তিত্ব , প্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ। যে অঞ্চলে যতবেশি বৃক্ষরাজি, সে অঞ্চল ততোবেশি প্রাণবন্ত। গাছ ছাড়া বেঁচে থাকা নিরুপায়। গাছ থেকে যে অক্সিজেন আমরা পাই, তার মাধ্যমে আমাদের জীবন ঠিকে থাকে। বৃক্ষরোপন হচ্ছে ঝুঁকিহীন এক সুন্দর আগামীর নিরাপদ বিনিয়োগ। সবুজ-শ্যামল নিসর্গ মূলত গাছকে ঘিরেই। গাছ আমাদের জীবনের ছায়া। প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গাছের বিকল্প নেই। ভূমিকম্পসহ যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিনে দিনে যে মাত্রায় বাড়ছে, যে হারে বাড়ছে জনসংখ্যা পাশাপাশি নগরায়ণ তো আছেই, এর মাঝে বাড়ছে বিষাক্ত ধোঁয়া, বাতাসে সিসার পরিমাণ।


ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগপরিবেশগত বিরূপতায় আমরা মুখোমুখি হচ্ছি খরা, বন্যা, ঝড়, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পসহ নানা ধরনের ভয়াবহ প্রতিকূলতার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধে গাছ পালন করে উপকারী বন্ধুর ভূমিকা। গাছ সৃষ্টির এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে, স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তা হতে উদগত করেছি নয়ন জুড়ানো সব ধরনের উদ্ভিদ। এটি আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ। আকাশ থেকে আমি বর্ষণ করি উপকারী বৃষ্টি এবং তা দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান, শস্যরাজি ও সমুন্নত খেজুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর’-সুরা কাফ, আয়াত : ৭-১০।


জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে কোন মুসলিম কোন গাছ লাগায়, অতঃপর তা থেকে যতটা খাওয়া হয়, তা তার জন্য সাদকাহ হয়, তা থেকে যতটুকু চুরি হয়, তা তার জন্য সাদকাহ হয় এবং যে কোনো ব্যক্তি তার থেকে কিছু গ্রহণ করে, সেটাও তার জন্য সাদকাহ হয়ে যায়।’’ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, মুসলিম যে গাছ লাগায়, আর তা থেকে কোনো মানুষ, কোনো জন্তু এবং কোনো পাখী যা কিছু খায়, তা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য সাদকাহ হয়ে যায়।’’ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, মুসলিম যে গাছ লাগায় এবং ফসল বুনে অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, কোন জন্তু অথবা অন্য কিছু খায়, তবে তা তার জন্য সাদকাহ হয়ে যায়।’’-মুসলিম ১৫৫২, আহমদ ১৩৮৫৯, ১৪৭৭৯, দারেমি ২৬১০।


আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন, ‘তিনিই লতা ও বৃক্ষ উদ্যানগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদবিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জলপাই বাগান সৃষ্টি করেছেন। তারা একে অন্যের মতো এবং আলাদা। যখন গাছ ফলবান হয়, তখন তোমরা গাছের ফল আহার করবে। আর ফসল তোলার দিনে তার দেয় প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না’-(সুরা আনআম, আয়াত : ১৪১)। ‘তারা কি জমিনের প্রতি লক্ষ করে না? আমি তাতে প্রত্যেক প্রকারের কত উৎকৃষ্ট উদ্ভিদ উদগত করেছি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়’-সুরা শোআরা, আয়াত : ৭-৮। বৃক্ষ ও প্রাণী একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাণীদের বেঁচে থাকার প্রধান ও মূল উপকরণ হল অক্সিজেন, যা বৃক্ষ থেকেই উৎপন্ন হয়। প্রত্যেক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে প্রাণীজগৎ কার্বনডাই অক্সাইড বর্জন করে। এটি এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বৃক্ষ সেই দূষিত কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং প্রাণীকুলের বেঁচে থাকার মূল উপাদান অক্সিজেন নিঃসরণ করে। আর তাই ইসলাম বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অপরিসীম। গাছপালার উপকারিতা : রিযিকের উৎস : গাছ থেকে উৎপাদিত ফল-ফসল খেয়ে প্রানীকুল জীবন ধারণ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি আকাশ থেকে বারি (বৃষ্টি) বর্ষণ করি পরিমাণমত। অতঃপর তা যমীনে সংরক্ষণ করি। আর আমরা ওটাকে সরিয়ে নিতেও সক্ষম। অতঃপর আমরা তা দিয়ে তোমাদের খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করি। তোমাদের জন্য সেখানে থাকে প্রচুর ফল-ফলাদি এবং তোমরা তা থেকে ভক্ষণ করে থাক।





আর আমরা সৃষ্টি করেছি (যয়তুন) বৃক্ষ। যা সিনাই পর্বতে জন্মায়। যা থেকে উৎপন্ন হয় তৈল এবং ভক্ষণকারীদের জন্য রুচিকর খাদ্য’-সূরা মুমিনূন: ১৮-২০। গবাদিপশুর জীবিকা : ও বৃক্ষ, লতা-পাতা থেকে উৎপন্ন হয় : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি দেখে না যে, আমরা ঊষর ভূমিতে (বৃষ্টির) পানি প্রবাহিত করি। অতঃপর তার মাধ্যমে শস্য উৎপাদন করি। যা থেকে ভক্ষণ করে তাদের গবাদিপশু এবং তারা নিজেরা। এর পরেও কি তারা উপলব্ধি করবে না?’-সূরা : সাজদাহ, ২৭। আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের জন্য শস্য ও ফলমূল উৎপন্ন করেন : তিনি বলেন, ‘আমরা পানিপূর্ণ মেঘমালা হ’তে প্রচুর বারিপাত করি। যাতে তা দ্বারা উৎপন্ন করি শস্য ও উদ্ভিদ এবং ঘনপল্লবিত উদ্যানসমূহ’-সূরা : নাবা, ১৪-১৬। আল্লাহর অপার দান ফসল ও ফলমূল : তিনি বলেন, ‘তোমরা যে শস্য বীজ বপন কর, সে বিষয়ে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা কি ওটা উৎপন্ন কর, না আমরা উৎপন্ন করি? আমরা যদি ইচ্ছা করি তবে অবশ্যই ওটাকে খড়-কুটায় পরিণত করতে পারি। তখন তোমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। (তখন তোমরা বলবে) আমরা তো নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে গেলাম। বরং আমরা তো বঞ্চিত হয়ে গেলাম’-সূরা : ওয়াক্বি‘আহ, ৬৩-৬৭। বৃক্ষে বান্দার জন্য উপদেশ ও রিযিক : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর পৃথিবীকে আমরা প্রসারিত করেছি এবং তাতে পাহাড় সমূহ স্থাপন করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি সকলপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদরাজি। প্রত্যেক বিনীত ব্যক্তির জন্য, যা চাক্ষুষ জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ। আর আমরা আকাশ থেকে বরকতময় বৃষ্টি বর্ষণ করি। অতঃপর তার মাধ্যমে বাগান ও শস্য বীজ উদ্গত করি এবং দীর্ঘ খর্জুর বৃক্ষসমূহ, যাতে থাকে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুরের মোচা। বান্দাদের জীবিকা হিসাবে। আর আমরা এর দ্বারা জীবিত করি মৃত জনপদকে। বস্ত্ততঃ এভাবেই হবে পুনরুত্থান’-সূরা : ক্বাফ, ৭-১১। আল্লাহর শৈল্পিক নৈপুণ্য প্রকাশকারী : বৃক্ষরাজি আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির শৈল্পিক নৈপুণ্য প্রকাশ করে। আল্লাহই সুনিপুণ স্রষ্টা। তিনি সৃষ্টি করেছেন বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদরাজি। এসবই আমাদের উপকারার্থে আল্লাহ সৃজন করেছেন। একই মাটি ও একই পানিতে আমরা বিভিন্ন উদ্ভিদ জন্মাতে দেখি, যাতে বিভিন্ন ফুল ও ফল হয়। যেগুলি প্রাণীকুলের জীবনোপকরণের জন্য আল্লাহর বিশাল অনুগ্রহ। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব মানুষ একবার লক্ষ্য করুক তার খাদ্যের দিকে। আমরা (কিভাবে তাদের জন্য) বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকি। অতঃপর ভূমিকে ভালভাবে বিদীর্ণ করি। অতঃপর তাতে উৎপন্ন করি খাদ্য-শস্য, আঙ্গুর ও শাক-সবজি, যায়তূন ও খর্জুর, ঘন পল্লবিত উদ্যানরাজি এবং ফল-মূল ও ঘাস-পাতা। তোমাদের ও তোমাদের গবাদিপশুর ভোগ্যবস্ত্ত হিসাবে’-সূরা : আবাসা, ২৪-৩২। আল্লাহর গুণকীর্তন করে গাছপালা: বৃক্ষরাজি থাকে রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত। এগুলি আল্লাহর গুণগান করে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে এবং সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীব-জন্তু ও বহু মানুষ? আর বহু মানুষ আছে তাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়েছে। বস্ত্ততঃ আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন তাকে সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা চান তাই-ই করেন’-সূরা : হজ্জ, ১৮। তিনি বলেন, ‘আর লতাগুল্ম ও বৃক্ষরাজি সিজদাবনত’-সূরা : আর রাহমান, ৬। জান্নাতের আপ্যায়ন: আল্লাহ তায়ালা জান্নাতবাসীকে বিভিন্ন রকমের ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন করবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আর ডান পাশের দল। কতই না ভাগ্যবান ডান পাশের দল! (তারা থাকবে) কাঁটাবিহীন কুল গাছের বাগানে। (সেখানে আরও থাকবে) কাঁদি ভরা কলা গাছ। তারা থাকবে প্রলম্বিত ছায়াতলে। সদা প্রবাহমান পানির মধ্যে। থাকবে প্রচুর ফলমূলের মধ্যে। যা শেষ হবে না, নিষেধও করা হবে না’-সূরা : ওয়াক্বি‘আহ, ২৭-৩৩। বৃক্ষরোপণের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৃক্ষরোপণ করতে হবে। কেননা তাতে মানবজাতি ও প্রাণীকুলের বৃহত্তর কল্যাণ সাধিত হয়ে থাকে। তাই রাসূল (ছাঃ) বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষপরিচর্যার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ করেছেন। একে ইবাদত হিসাবে গণ্য করেছেন। তিনি তার উম্মতকে বৃক্ষরোপণ করতে বারবার তাকীদ দিয়েছেন। যাতে উদ্ভিদ বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকে। একটি চারা থাকলেও তা রোপণ করতে হবে : কারো কাছে একটি চারা থাকলেও তা রোপণ করার নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যদি ক্বিয়ামত সংগঠিত হওয়ার সময়ও এসে যায়, আর তোমাদের হাতে একটি চারা গাছ থাকে, তাহ’লে বসা অবস্থায় থাকলে দাঁড়ানোর পূর্বেই যেন সে তা রোপণ করে দেয়’।-মুসনাদে আহমাদ হা/১৩০০৪। সাদাকাহ'র অনন্য মাধ্যম বৃক্ষরোপণ : বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ছাদাক্বার নেকী অর্জিত হয়। যেমন হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা তিনি দামেশকে বৃক্ষরোপণ করছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলল, আপনি এ কাজ করছেন, অথচ আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাবী? তখন তিনি বললেন, আপনি ব্যতিব্যস্ত হবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন বৃক্ষরোপণ করল, যা থেকে কোন মানুষ বা আল্লাহর কোন সৃষ্টিজীব ভক্ষণ করল, তাতে তার জন্য সাদাকাহ রয়েছে’।-মুসনাদে আহমাদ হা/২৭৫৪৬। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কোন মুসলমান যদি বৃক্ষ রোপণ করে বা ফসল চাষাবাদ করে, অতঃপর তা থেকে পাখী, মানুষ অথবা চতুষ্পদ প্রাণী কিছু খেয়ে নেয়, তবে তার জন্য সেটি ছাদাক্বাহ হিসাবে গণ্য হবে’।-বুখারি, হা/২৩২০; মুসলমি হা১৫৫২, মিশকাত, হা/১৯০০। মুমিনের উপমা সবুজ বৃক্ষের ন্যায় : সবুজ বৃক্ষের সাথে মুমিনের সাদৃশ্য বিষয়ে প্রসিদ্ধ একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিনের উপমা হ’ল এমন একটি সবুজ বৃক্ষের ন্যায়, যার পাতা ঝরে পড়ে না এবং মলিন হয় না। তখন কেউ বলল, এটি অমুক অমুক গাছ। তখন আমি বলতে চেয়েছিলাম যে, এটি খেজুর গাছ। তবে আমি অল্প বয়সী হওয়ায় বড়দের সামনে বলতে সংকোচ বোধ করলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিলেন যে, সেটি হ’ল খেজুর গাছ। অতঃপর ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি যদি এটা সবার সামনে বলতে, তবে তা এত এত ধন-সম্পদ থেকেও আমার জন্য বেশী খুশীর কারণ হ’ত’।-বুখারি হা/১৩১; মুসলিম হা/২৮১১। বৃক্ষ নিধন নিষিদ্ধ : বৃক্ষ প্রাণীকুলকে রোদের প্রচন্ড উত্তাপ থেকে ছায়া প্রদান করে। আমরা যত সুস্বাদু ফল-মূল ভক্ষণ করি, সবই বৃক্ষ থেকে আহরিত। মানবদেহের মরণব্যাধি অনেক রোগের ঔষধ এই বৃক্ষের নির্যাস থেকেই তৈরী হয়। তাই প্রিয় নবী মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপ্রয়োজনে বৃক্ষ নিধন করাকে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে কুল বৃক্ষ কর্তন করবে, আল্লাহ তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’।-আবুদাঊদ হা/৫২৩৯; মিশকাত হা/২৯৭০। হযরত আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বৃক্ষ কর্তনের ব্যাপারে সাবধান করেছেন। যেমন তিনি ইয়াযীদ বিন আবি সুফিয়ানকে শামে প্রেরণের সময় বিনা প্রয়োজনে কোন ফলবান বৃক্ষ কর্তন করতে নিষেধ করেছিলেন-।-বায়হাকি হা/১৮৬১৬; তিরমিযী হা/১৫৫২। বৃক্ষ নিধন আল্লাহর ক্রোধের কারণ : যারা বৃক্ষ নিধন করবেন, তারা আল্লাহ তায়ালার ক্রোধের শিকার হবেন। আল্লাহ বলেন, ‘যখন সে ফিরে যায় (অথবা নেতৃত্বে আসীন হয়), তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্য ও প্রাণী বিনাশের চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ অশান্তি পসন্দ করেন না’-সূরা : বাক্বারাহ, ২০৫। সুতরাং আমরা যেন পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত্র ও প্রাণী ধ্বংসের পাঁয়তারা করে আল্লাহর ক্রোধের শিকার না হই। ইকোসিস্টেমের পরিমিতিতে বৃক্ষ : আল্লাহ তায়ালার বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে পরিমিতভাবে সৃষ্টি হয়েছে বৃক্ষ। প্রত্যেক সৃষ্ট বস্ত্ত বা বিষয়ের মধ্যেও আল্লাহ আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর পৃথিবীকে আমরা বিস্তৃত করেছি এবং তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি। আর সেখানে আমরা প্রত্যেক বস্ত্ত উৎপন্ন করেছি পরিমিতভাবে’-সূরা : হিজর, ১৯। আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে বৃক্ষ এক অনন্য সৃষ্টি। এর রয়েছে বহুমুখী গুরুত্ব ও তাৎপর্য। বৃক্ষরাজি সহ সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেমকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা আবশ্যক। কেননা তাতেই নিহিত রয়েছে গোটা প্রাণী জগৎ, ভৌত জগৎ এবং তাদের মিথস্ক্রিয়া। এখানে মানুষ একটি উপাদান মাত্র এবং তার কল্যাণের জন্যই প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম অবশ্য প্রয়োজন। অন্যথা মনুষ্যজাতি নিজেও একদিন বিপন্ন ও বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। সমন্বয় বিধানের তাৎপর্য : আল্লাহর কোন সৃষ্টিকেই অমর্যাদা করা উচিত নয়। প্রয়োজন হ’ল তাকে যথার্থভাবে কাজে লাগানো। বৃক্ষরাজির পরিকল্পিত উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপরই মানুষের বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। পৃথিবীতে বৃক্ষের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকলে অক্সিজেনের অভাবে একসময় মানুষের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে। এমনকি মানবজীবনের জন্য এটা অত্যন্ত ক্ষতিকর ও মারাত্মক বিপর্যয়কর হয়ে উঠতে পারে। উদ্ভিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এ আশঙ্কায়ই বৃক্ষ নিধনকে নিতান্ত ক্ষতির কারণ বলে উল্লেখ করেন এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি যথার্থ গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।


পবিত্র কুরআনের উপরোক্ত আয়াতে আমরাভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় বিধানের দিকনির্দেশনা লাভ করি। আল্লাহ বলেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র নির্ধারিত হিসাব মতে সন্তরণশীল। বস্ত্ততঃ তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টিকুলের জন্য। যাতে রয়েছে ফলমূল ও আবরণযুক্ত খর্জুর বৃক্ষ। আর রয়েছে খোসাযুক্ত শস্যদানা ও সুগন্ধি গুল্ম। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন নে‘মতকে অস্বীকার করবে?’-সূরা : আর-রাহমান, ১০-১৩। এতে বুঝা যায় যে, মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্ররাজির নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তনের মাধ্যমে প্রাণীকুলের জন্য সৃজিত পৃথিবীর মাটিকে তৃণলতা ও বৃক্ষরাজির ফলমূল ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ অথবা পানির এ ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় বিধানের মাধ্যমে আল্লাহ জীবজগতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। আর তাই ইসলাম বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করে। সেকারণ ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য আমাদের ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ ও তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। প্রকৃতির আঘাত থেকে বাঁচতে চাইলে অবশ্যই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো বিকশিত হতে দিতে হবে। দেশে বনায়নের পরিমাণ বাড়াতে হবে। সবুজের সমারোহ আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য বর্ষা হচ্ছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়।


সময় বৃক্ষরোপণ করলে খুব বেশি পরিচর্যা করা লাগে না। প্রকৃতিই সকাল-বিকাল বৃষ্টি ঝরিয়ে গাছের পরিচর্যা করে। আসুন! এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে আমরা সবাই একটি করে ফলাদার-ছায়াদার বৃক্ষরোপণ করি। আল্লাহতায়ালা আমাদের তওফিক দিন। আমিন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ