ঢাকা , বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ , ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালুরঘাট সেতু ইতিহাসের সাক্ষী, অবহেলারও প্রতীক: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী


আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-০৭ ১১:৫৬:৩৪
কালুরঘাট সেতু ইতিহাসের সাক্ষী, অবহেলারও প্রতীক: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী কালুরঘাট সেতু ইতিহাসের সাক্ষী, অবহেলারও প্রতীক: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী
নিজস্ব প্রতিবেদক


একটি সেতু কখনো শুধু ইট, পাথর, লোহা ও কংক্রিটের সমষ্টি নয়; একটি সেতু মানুষের জীবন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কালুরঘাট সেতু ঠিক তেমনই একটি প্রতীক। এটি একদিকে ইতিহাসের সাক্ষী, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অবহেলা, প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা এবং উন্নয়ন বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। আমি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সন্তান। আমার শৈশব, কৈশোর এবং বেড়ে ওঠার সঙ্গে কালুরঘাট সেতুর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।


ছোটবেলায় অসংখ্যবার এই সেতু পার হয়েছিকখনো পরিবারের সঙ্গে, কখনো পড়াশোনার প্রয়োজনে, কখনো সামাজিক কিংবা সাংগঠনিক কাজে। তখনও দেখেছি মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট, অনিশ্চয়তা এবং দুর্ভোগ। আজও সেই দৃশ্যের খুব বেশি পরিবর্তন ঘটেনি। প্রযুক্তি এগিয়েছে, দেশের অর্থনীতি বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে; কিন্তু দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহু প্রতীক্ষিত আধুনিক কালুরঘাট সেতুর স্বপ্ন এখনও বাস্তব রূপ পায়নি।


কালুরঘাট সেতুর গুরুত্ব বোঝার জন্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা বুঝতে হবে। বোয়ালখালী, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, এমনকি কক্সবাজারমুখী যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় কালুরঘাট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবিকার সন্ধানে, শিক্ষার উদ্দেশ্যে, চিকিৎসার জন্য কিংবা ব্যবসায়িক কাজে এই পথে চলাচল করেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই সেতু আজও আধুনিক চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। একই কাঠামোতে রেল ও সড়ক চলাচল, সীমিত প্রস্থ, পুরোনো অবকাঠামো এবং যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের দুর্ভোগকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।


রেল চলাচলের সময় যানবাহন থেমে থাকে, দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়, মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি করে, একজন রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না, একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বাজারে যেতে বিলম্বিত হন, একজন শ্রমিক কর্মস্থলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন এসবই একটি অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। উন্নয়নের সূচকে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কালুরঘাট সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণ চট্টগ্রাম কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটনের সম্ভাবনাময় অঞ্চল। দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত হলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজে বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।


একটি আধুনিক সেতু শুধু যানবাহনের চলাচল সহজ করবে না; এটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দেবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং অসংখ্য বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বকে উন্নয়নের নতুন দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করাও সময়ের দাবি। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সমানভাবে তার সুফল ভোগ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কালুরঘাট সেতুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতি মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। উন্নয়ন প্রকল্পে বিলম্ব মানে শুধু সময়ের অপচয় নয়; এর অর্থ অর্থনৈতিক ক্ষতি, উৎপাদনশীলতার হ্রাস এবং মানুষের দুর্ভোগের স্থায়ীকরণ। একটি আধুনিক কালুরঘাট সেতু নির্মিত হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই উন্নত হবে না; দক্ষিণ চট্টগ্রামের সামগ্রিক জীবনমানও বদলে যাবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, বিনিয়োগ বাড়বে, পর্যটন বিকশিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও সহজলভ্য হবে।


একই সঙ্গে যানজটদুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ অবকাঠামোই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। যে অঞ্চলের যোগাযোগ যত উন্নত, সেই অঞ্চলের অর্থনীতি তত শক্তিশালী। এই বাস্তবতায় কালুরঘাট সেতুর উন্নয়ন কেবল একটি আঞ্চলিক দাবি নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনারও অংশ হওয়া উচিত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ বহু বছর ধরে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তারা আন্দোলন করেছেন, মানববন্ধন করেছেন, স্মারকলিপি দিয়েছেন, জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয়নি। উন্নয়নের সুফল যেন রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায় এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের ন্যায়সংগত উন্নয়ন নীতির মূল ভিত্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে, অবকাঠামো উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; এটি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি নিরাপদ সেতু মানুষের জীবন রক্ষা করে, অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলে। আমি একজন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এবং একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কালুরঘাটে একটি আধুনিক, প্রশস্ত ও নিরাপদ সেতু নির্মাণ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন। আজকের বিনিয়োগ আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমার আন্তরিক আহ্বান কালুরঘাট সেতু নির্মাণ প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। প্রকল্প যেন আর কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে; দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের প্রজন্ম বহু প্রতিশ্রুতি শুনেছে।


ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আর প্রতিশ্রুতির ইতিহাস না পড়ে; তারা যেন বাস্তব উন্নয়নের ইতিহাস রচনা করতে পারে। কালুরঘাট সেতু সেই ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। আজ সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। উন্নয়নের বাংলাদেশে কালুরঘাট সেতু আর অবহেলার প্রতীক হয়ে থাকবে কেন? দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ এই সেতুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই কালুরঘাটে একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি মানুষের ন্যায্য অধিকার, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অঙ্গ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের স্বপ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে দূরত্ব যেন আর না বাড়ে।

কালুরঘাট সেতুর নতুন নির্মাণ হোক উন্নয়নের নতুন অঙ্গীকার, সমতার নতুন দৃষ্টান্ত এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল মাইলফলক। লেখক: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী যুগ্ম সদস্য সচিব, নাগরিক ছাত্র ঐক্য কেন্দ্রীয় সংসদ

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ