ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও উৎকোচ দাবির অভিযোগ
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও উৎকোচ দাবির অভিযোগ
কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ
মোঃ জাকারিয়া হোসেন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আখতারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থ বিতরণে অনিয়ম, উৎকোচ দাবি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা কুড়িগ্রাম-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১৫ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়।
২০ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের পর বিদ্যালয়গুলো ১২ হাজার থেকে ১৯ হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সংশ্লিষ্ট অর্থ উত্তোলন করে নিজের হিসাবে জমা রাখেন। পরে বিদ্যালয়প্রতি ১ হাজার ৪০০ টাকা উৎকোচের বিনিময়ে মাত্র ২৮ থেকে ৩০টি বিদ্যালয়ে অর্থ প্রদান করা হয়। উৎকোচ দিতে অস্বীকৃতি জানানো অন্যান্য বিদ্যালয়ের বরাদ্দ আটকে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়প্রতি ৭ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৫০০ টাকা উৎকোচের বিনিময়ে চেক প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবশিষ্ট প্রায় ৩০টি বিদ্যালয় উৎকোচ না দেওয়ায় এখনও তাদের বরাদ্দের অর্থ পায়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য দেড় লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলেও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সেই অর্থ উত্তোলন করে নিজের হিসাবে জমা রাখেন এবং বিদ্যালয়প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করেন। উৎকোচ না দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলো এখনও বরাদ্দের অর্থ পায়নি।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ভোটহাট ও দক্ষিণ চর-ভূরুঙ্গামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামতের জন্য এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে কোনো অর্থ প্রদান না করে পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে উপজেলার ৩৯ জন নৈশপ্রহরীর বেতন বাবদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও উৎকোচের বিনিময়ে মাত্র দুই থেকে তিনজন নৈশপ্রহরীকে বেতন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি নৈশপ্রহরীরা উৎকোচ না দেওয়ায় তাদের বেতনের অর্থ ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানান, তারা নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে প্রয়োজনীয় ভাউচার দাখিল করেছেন। পরবর্তীতে ভাউচারের ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশনা অনুযায়ী তা সংশোধন করলেও এখনও তাদের হিসাবে বরাদ্দের অর্থ জমা হয়নি। তাদের দাবি, যারা উৎকোচ দিয়েছেন তারাই কেবল অর্থ পেয়েছেন। আন্ধারীঝাড় ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন—এমন বিদ্যালয়গুলোই বরাদ্দের অর্থ পেয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আখতারুল ইসলাম রংপুর থেকে অফিস করেন এবং সপ্তাহে সোম, মঙ্গল ও বুধবার অফিসে উপস্থিত থাকেন। ফলে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে আসা শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আখতারুল ইসলাম সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, “আমি উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে অফিসে আসার নির্দেশ দিয়েছি। স্লিপের টাকা এবং ভোটকেন্দ্র মেরামতের বরাদ্দ দ্রুত বিদ্যালয়গুলোর হিসাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
কুড়িগ্রাম-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “আমি হোয়াটসঅ্যাপে এ-সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স