আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাজারে দামের ধস— এই তিন সংকটে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার ভুট্টাচাষিরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ায় অনেক কৃষক লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তার ওপর বাজারে ভুট্টার দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
এ অবস্থায় ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে কৃষকদের আগাম আমন ধান, পাট ও বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি চাষের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।
চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের বজরাদিয়ার খাতা চর এলাকার কৃষক মোঃ মাহফুজার রহমান এ বছর ১০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেন। তবে বাজারে দাম কমে যাওয়ায় মাড়াই করা ভুট্টা বিক্রি না করে সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
মোঃ মাহফুজার রহমান বলেন, ‘মৌসুমজুড়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার কারণে অনেক গাছ হেলে পড়ে। সময়মতো সার প্রয়োগও করা যায়নি। ফলে প্রত্যাশিত ফলন পাইনি। এখন বাজারে দাম এত কম যে বিক্রি করেও তেমন লাভ থাকছে না।’
তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ভুট্টা উৎপাদনে বীজ, জমি প্রস্তুত, শ্রমিক, সার, কীটনাশক, সেচ, মাড়াই ও পরিবহনসহ মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৯০০ টাকা। বিপরীতে এক বিঘায় ফলন হয়েছে প্রায় ৬০ মণ।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ভুট্টা বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। সে হিসাবে প্রতি মণে উৎপাদন ব্যয় পড়েছে প্রায় ৬৬৫ টাকা। ফলে মণপ্রতি লাভ থাকছে মাত্র ১৩৫ টাকার মতো, যা কৃষকদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
চিলমারী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চিলমারীতে ২ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। কৃষকদের উৎপাদিত ভুট্টা ভালোভাবে শুকিয়ে আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের নিচে নামিয়ে সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক ক্ষেতেই গাছ পরিপক্ব হওয়ার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ফলন কম হয়েছে। আবার বর্তমানে বাজারমূল্যও আশানুরূপ নয়। কৃষকরা চাইলে ভুট্টা শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারেন। পাশাপাশি আগাম আমন ধান, পাট ও বিভিন্ন রবি শস্য কিংবা শাক-সবজি চাষ করে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারেন।’
এদিকে কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত ভুট্টা বাজারজাত করা হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব উৎপাদন ও বিপণন— দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেলায় মোট ১ হাজার ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোঃ শামছুদ্দোহা বলেন, ‘এপ্রিল ও মে মাসে কুড়িগ্রামে কয়েক দফা ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর পেছনে ঘন ঘন পশ্চিমা লঘুচাপের সৃষ্টি এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র পূর্বালী বায়ুর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে শক্তিশালী বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ায় স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, এমন পরিস্থিতিতে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপ্রবণ হয়ে ওঠে।’
অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বাজারে মূল্যপতনের দ্বৈত চাপে এখন চিলমারীর ভুট্টাচাষিদের চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। কৃষকদের আশা, বাজারমূল্য কিছুটা বাড়লে অন্তত উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য লাভের মুখ দেখতে পারবেন তারা।