ঢাকা , রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎তিন যুগের অপেক্ষা, একটি সেতুর অভাবে বন্দি সাহেবের চর

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৫-০৯ ২২:২৩:৫৩
‎তিন যুগের অপেক্ষা, একটি সেতুর অভাবে বন্দি সাহেবের চর ‎তিন যুগের অপেক্ষা, একটি সেতুর অভাবে বন্দি সাহেবের চর

মাহফুজ রাজা,স্টাফ রিপোর্টার:

‎কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সাহেবের চর গ্রাম। চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, নদীর সৌন্দর্য আর প্রকৃতির অপার মায়া।
‎কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

‎মাত্র একটি ছোট সেতুর অভাবেই তিন যুগ ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছে পুরো গ্রামের মানুষ।
‎এই পথ দিয়েই যেতে হয় কৃষকের মাঠে।
‎এই পথ দিয়েই স্কুল-কলেজে যায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

‎কিন্তু রাস্তা নেই, সেতু নেই—
‎আছে শুধু বুকসমান পানি আর জীবনের ঝুঁকি।
‎ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা খালটি পুনঃখননের পর বছরের বেশিরভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে চলাচলের পথ।

‎ফলে প্রায় ৫০০ একর আবাদি জমিতে যেতে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় কৃষকদের।
‎কাঁধে লাঙ্গল, হাতে ফসল, সঙ্গে গরু-ছাগল নিয়ে পানির মধ্য দিয়ে পার হতে গিয়ে যেন প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় তাদের।

‎কখনো কাদায় পড়ে নষ্ট হয় ফসল, কখনো পানিতে পড়ে আহত হয় মানুষ।
‎কেউ দেখার নেই,
‎কেউ শোনার নেই।

‎শুধু কৃষকরাই নয়—স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ যেন আরও হৃদয়বিদারক।
‎জামা-কাপড় ভিজিয়ে, বইখাতা মাথায় তুলে প্রতিদিন পার হতে হয় এই খাল।
‎অনেক সময় ভিজে বই নষ্ট হয়, আবার অনেকেই কষ্টে স্কুলে যেতেই চায় না।
‎স্বপ্নগুলো যেন পানির স্রোতেই হারিয়ে যাচ্ছে।

‎স্থানীয় গ্রামবাসী জয়নাল (৬৫) বলেন,
‎“আমরা ছোটবেলা থেইকা এই কষ্ট দেইখা আসতেছি। কত চেয়ারম্যান-মেম্বার আইছে, সেতুর কথা কইছে, কিন্তু আজও কিছুই হইলো না। বর্ষা আইলেই আমরা বন্দি হইয়া যাই।”

‎আরেক গ্রামবাসী শফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন,
‎“আমাগো কৃষিপণ্য মাঠ থেইকা আনতেই অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় পানিতে পড়ে ফসল নষ্ট হয়। বাচ্চারা স্কুলে যাইতে ভয় পায়। একটা ছোট সেতুর জন্য কত বছর অপেক্ষা করুম?”

‎এলাকাবাসী জানান,
‎নির্বাচন এলে জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের শেষ থাকে না। কেউ বলেন সেতু হবে, কেউ বলেন কাজ শুরু হবে খুব দ্রুত।

‎কিন্তু ভোট শেষ হলে প্রতিশ্রুতিও শেষ হয়ে যায়।
‎বহুবার পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় উঠে এসেছে সাহেবের চরের মানুষের এই সীমাহীন দুর্ভোগের চিত্র।
‎সংবাদ হয়েছে, প্রতিবেদন হয়েছে, ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মানুষের কান্না আর কষ্টের গল্প।
‎তবুও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।

‎আজও একটি ছোট সেতুর অপেক্ষায় দিন গুনছে পুরো গ্রাম।
‎আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুঝুঁকির বাঁশের সাঁকো, যেখানে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
‎ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই চলাচল করছে হাজারো মানুষ।

‎গ্রামবাসীর প্রশ্ন—
‎স্বাধীনতার এত বছর পরও কি একটি ছোট সেতু পাওয়ার অধিকার নেই তাদের?
‎কত কষ্ট, কত কান্না, কত দুর্ভোগ দেখলে জাগবে দায়িত্বশীলদের বিবেক?

‎সাহেবের চরবাসীর একটাই দাবি—
‎দ্রুত একটি সেতু নির্মাণ করা হোক।
‎যাতে কৃষক বাঁচে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, আর একটি গ্রামের দীর্ঘদিনের কান্নার অবসান হয়।


নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ