নববর্ষে ছুটির প্রণেতা শের-ই বাংলা
নববর্ষে ছুটির প্রণেতা শের-ই বাংলা
সালমা ফাইয়াজ :
দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালীর অন্তরে পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩, ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সবার উৎসব। বাংলাদেশের সকল স্তরের মানুষের জন্যে এই নববর্ষ উৎসবটি ধর্ম নিরপেক্ষ উৎসব। পহেলা বৈশাখে আয়োজিত বাঙালির নববর্ষের উৎসবে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র এবং অনেকাংশে রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সকলেই উদার ও আনন্দিত চিত্তে অংশগ্রহণ করেন। আমরা যে ধর্ম নিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছি। পহেলা বৈশাখের নববর্ষ উদযাপন সেই চেতনা ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ধারক-বাহক।
পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মাতোয়ারা হবে সারা বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে রাজধানী এবং দেশজুড়ে থাকছে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। জেনে আনন্দিত নতুন সরকার ও সরকারের সুযোগ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩' জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। এদিকে শের- ই - বাংলা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমরা বাঙালির এই সার্বজনীন জাতীয় ও সামাজিক উৎসবকে সাড়া দেশে বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনায় পালনের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাই।শের-ই বাংলা ফাউন্ডেশনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের জাতীয় এ উৎসবে জনগণ নতুন রূপ নিয়ে আসবে আশা করি।
আমাদের অনেকে হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম পহেলা বৈশাখ আড়ম্বরপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পালনের সূচনা করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। শের-ই বাংলা ফাউন্ডেশন সরকারের কাছে তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদানের আবেদন জানিয়েছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হোক’—এই জনদাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ করে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণের উৎসব হিসেবে পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে প্রথম সরকারি ছুটির ঘোষণা করেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক। তিনি এ ঘোষণা করেন ১৯৫৪ সালে। সে বছর থেকেই ব্যাপক হারে গ্রাম-শহর জুড়ে বাংলা নববর্ষ পালন, আনন্দ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। তার আগে তা সীমিত ছিল গ্রামের মেলা, বাউল গান, জারি গানের অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, চৈত্রসংক্রান্তি শেষে হালখাতার মধ্যে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির নিকটে বর্ধমান হাউজ কে বাংলা একাডেমি প্রতিস্ঠায় সংসদে বিল পাশ করা ও পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি প্রতিস্ঠার সূচনা ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারন পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি জাতি সত্তার বিকাশে এ একাডেমি রাস্ট্রীয় পর্যায়ে অনবদ্য ভূমিকা রেখে আসছে।
আবুল কাশেম ফজলুল হক যিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা,ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ,আধুনিক বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা,অবিভক্ত বাংলার স্বাধীনতার মুক্তির দিশারি। তার সময়কালে অন্যতম বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। তিনি ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ হেরে গেলে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন। এ কে ফজলুল হক ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম প্রতীক।
ফজলুল হক একাধারে ছিলেন মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস সদস্য। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির দ্যোতনার অন্যতম মুখ। অবিভক্ত বাংলায় তিনি গড়েছিলেন নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি। সর্বশেষ তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল কৃষক শ্রমিক পার্টি। কারণ তিনি ছিলেন কৃষক দরদি মানুষ। আর তার কৃষক প্রেম থেকেই বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বাংলার কৃষকদের চিনেছিলেন খুব কাছ থেকে। এই অসাধারণ বাঙালি ব্যক্তিত্বের হাত ধরেই বাংলার নববর্ষ পহেলা বৈশাখ সবার কাছে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের কাছে শের-ই বাংলা ফাউন্ডেশন, শের-ই বাংলা এ কে ফজলুল হকের পরিবার ও পুরো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে আবেদন—এই দিনটি সাড়ম্বরে নতুন করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পালনের সূচনা হোক। তাকে যথাযথ মর্যাদায় স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় পহেলা বৈশাখ আমাদেরকে বাঙালি জাতি সত্তার লালন ও বিকাশে বিশেষ ভুমিকা রাখবে এ প্রত্যাশা করি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মানে পহেলা বৈশাখের চেতনা ও সংস্কৃতি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে খাঁটি বাঙালী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে,তাই পহেলা বৈশাখ হোক আমাদের সার্বজনীন জাতীয় উৎসব ।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স