ঢাকা , সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ , ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বরিশালেও ছড়িয়েছে অতি সংক্রামক রোগ “হাম”, বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৩-৩০ ১৬:৫৯:৫৩
বরিশালেও ছড়িয়েছে অতি সংক্রামক রোগ “হাম”, বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু বরিশালেও ছড়িয়েছে অতি সংক্রামক রোগ “হাম”, বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু
 
রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি:
 
হঠাৎ করেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রামক রোগ “হাম” এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। অতি সংক্রাকম বা ছোঁয়াচে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চল বরিশাল বিভাগেও।
 
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চলতি মার্চ মাসে এ পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে মোট ১৩০ জন শিশু হাম-রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে সাত মাসের এক শিশুর। বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছে প্রায় ৪০ জন। যার মধ্যে বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৪ থেকে ৭ মাস।
 
এদিকে বরিশাল বিভাগে “হাম” রোগ ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাড়তি প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু এবং আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রস্তুত করা হয়েছে পৃথক কক্ষ।
 
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা কার্যক্রমে ঘাটতির কারণে হামের রোগী বাড়ছে। এই রোগটি একজনের হাচি-কাশির মাধ্যমে ১২-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে “হাম”। তাই শুধু কক্ষ নয়, বরিশালে শিশুদের জন্য আইসিইউ কেয়ার চালুর পাশাপাশি টিকা কার্যক্রমে জোড় দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
 
 বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু এবং আইসোলেশন ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, চলতি মার্চ মাসে এ পর্যন্ত দুটি ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত মোট ৮৯ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিচতলায় আইসোলেশন (ডায়েরিয়া) ওয়ার্ডে ৭৪ জন এবং শিশু ওয়ার্ডে ১৫ জন। দুটি ওয়ার্ডে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৯ জন। এর মধ্যে গত ২৭ মার্চ এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
 
আইসোলেশন ওয়ার্ডে মৃত্যু হওয়া ৭ মাসের ওই শিশুর নাম সাফওয়ান। সে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা। গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় তাকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন রাত ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। ইতোপূর্বে তার নিউমোনিয়া ছিল।
 
আইসোলেশন ওয়ার্ডের ইনচার্জ, সিনিয়র স্টাফ নার্স সেলিনা আক্তার জানিয়েছেন, হামের রোগী বেড়ে যাওয়ায় তাদের চিকিৎসার জন্য পৃথক দুটি কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি কক্ষে চারটি শয্যা থাকলেও নতুন কক্ষটির মেঝেতে শিশুদের রাখা হচ্ছে। একেকটি বেডে ২-৩ জন করে শিশুকে রাখা হচ্ছে। একইভাবে দ্বিতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ডের মধ্যেই হামের রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানকার ১৫টি বেডে ১৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
 
সরেজমিনে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, হামে আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশু পটুয়াখালী এবং বরগুনা জেলার বাসিন্দা। আক্রান্ত শিশুরাদের প্রতি ৫০ জনের মধ্যে এক থেকে দু’জন শিশু হামের টিকা নিয়েছে। বাকিরা টিকা নেয়নি। এমনকি মৃত্যু হওয়া সাফওয়ানকেও হামের টিকা দেয়া হয়নি। চিকিৎসাধীন শিশুদের মুখমন্ডল থেকে সমস্ত শরীরজুড়ে লালচে ফুসকুড়ি (র‌্যাশ) উঠেছে, গায়ে জ্বর এবং হাচি-কাশি রয়েছে।
 
চিকিৎসাধীন বরগুনা সদর উপজেলার পূর্ব ঘটবাড়িয়া গ্রামের ১ বছর ৭ মাসের শিশু রাফসানের মা সনিয়া আক্তার জানান, ছেলে শরীরে প্রচুর জ্বর আসলে গত ২২ মার্চ তাকে বরগুনা হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখান থেকে জানানো হয় রাফসানের নিউমোনিয়া হয়েছে। এরপর শনিবার উন্নত চিকিৎসার জন্য শেবাচিম হাসপাতালে রেফার করে। ছেলেকে হামের টিকা দেয়াননি তিনি।
 
পটুয়াখালী সদর উপজেলার কালিকাপুড় গ্রামের মাসের শিশু আরাফাতের মা আয়শা বেগম জানান, গত ২৪ মার্চ আরাফাতকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করান। এর আগে পটুয়াখালীতে ১৬ দিন নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিয়েছে। এখন শরীরে লাল সুফকুড়িতে (র‌্যাস) ছেয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলেছে, আরাফাত হামে আক্রান্ত।
 
আয়েশা বলেন, ৯ মাস বয়সে আরাফাতকে হামের টিকা দেওয়ার জন্য টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমাদের জানানো হয় গত ৩/৪ মাস ধরে হামের টিকা সরবরাহ নেই। এ কারণে আরাফাতকে টিকা দেওয়া হয়নি।
 
বরিশালের রহমতপুরের লিলেন মোল্লার ৪ মাসের মেয়ে নুসাইবা এবং পটুয়াখালীর কমলাপুর গ্রামের মনিরুল ইসলামের ৭ মাসের কন্যা হাবিবাও হাম রোগ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বয়স না হওয়ায় তাদের হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে জানান তাদের বাবা-মায়েরা। মূলতঃ গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে দেশজুড়ে হামের টিকা সংকট। এ কারণে টিকা বঞ্ছিত হচ্ছে শিশুরা। হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসিনতা হামে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিভাগের একটি মহল।
 
হাম রোগের লক্ষ্যণ
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেন, ‘মূলতঃ বসন্তকালে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। শরীরে প্রচন্ড জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল, গলা ব্যাথা, মুখে ক্ষত, শরীর দুর্বল, ক্ষুদামন্দা, ডায়েরিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া এবং জ্বর হওয়ার ৪/৫ দিন পর মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লালচে দানার মতো র‌্যাশ উঠা হামের লক্ষ্যণ।
 
তিনি বলেন, হাম অন্যান্য সংক্রামক রোগগুলোর থেকে ভয়াবহ। এটি ছোঁয়াচে রোগ। হাচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। একজন শিশু আক্রান্ত হলে তার মাধ্যমে আরও ১২ থেকে ১৮ জন শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হাম আক্রান্ত হওয়ার পাঁচদিন আগে এবং পাঁচদিন পরে হাচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায়।
 
হাম প্রতিরোধে করোনীয়
বিশেষ চিকিৎসক বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেন, ‘প্রথমত শিশুদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য শিশুকে জন্মের ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ এবং ছয় মাস পর বুকের দুধের সাথে বাড়তি খাবার খাওয়াতে হবে। সময়মত টিকা দিতে হবে।
 
তিনি বলেন, সাধারণত ৯ মাসের পর থেকে শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে। অথচ এখন তার কম বয়সের শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এজন্য টিকা কার্যক্রম নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে ভাবতে হবে। টিকা কার্যক্রমটা আরও এগিয়ে নেয়া যায় কিনা সেই বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
 
আক্রান্ত হলে করণীয়
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেন, ‘হামের একটি লক্ষ্যণও যদি শিশুর মাঝে দেখা যায়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ কিনা নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। কোন রকম দেরি করা যাবে না।
 
কেননা এতে খুব দ্রুতই জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। ডায়েরিয়া, নিউমোনিয়া, চোখের ইনফেকশন, মস্তিস্কে প্রদাহ দ্রুত অবনতির দিকে যায়। আর তখনই হাইফ্লো অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুঃখজন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের শিশুদের জন্য এমন কোন উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাই নেই।
 
এজন্য বৃহত্তর শেবাচিম হাসপাতালে শিশুদের আধুনিক এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করতে আইসোলেশন ওয়ার্ড, আইসোলেশন বেড, হাইফ্লো অক্সিজেনসহ শিশুদের আইসিইউ কেয়ার চালু করা এবং পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স পদায়নের দাবি জানান এই চিকিৎসক।
 
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ