ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ , ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​রাঙ্গাবালীতে হাসপাতালের জন্য হাহাকার, ‎চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত প্রায় দুই লাখ মানুষ।

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৩-১১ ১৪:০১:১৭
​রাঙ্গাবালীতে হাসপাতালের জন্য হাহাকার, ‎চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত প্রায় দুই লাখ মানুষ। ​রাঙ্গাবালীতে হাসপাতালের জন্য হাহাকার, ‎চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত প্রায় দুই লাখ মানুষ।
 

মোঃ কাওছার আহম্মেদ, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

রোগী মুমূর্ষু। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু সামনে উত্তাল আগুনমুখা নদী, চারপাশে পানি আর অনিশ্চিত নৌ-যোগাযোগ। হাসপাতালে পৌঁছাতে হলে পাড়ি দিতে হবে নদী, তারপর কয়েক ঘণ্টার পথ। এই বাস্তবতাই প্রতিদিনের জীবন রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের।

‎‎দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও আগুনমুখা নদীবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী। তিনদিকে নদী আর একদিকে সাগরঘেরা এই জনপদ। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক যুগেও এই উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলার মানুষ এখনো বঞ্চিত ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে।
‎‎উপজেলাটিতে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। এমনকি নেই একজন সরকারি এমবিবিএস ডাক্তারও। ফলে জরুরি চিকিৎসা পেতে হলে এখানকার মানুষকে পাড়ি দিতে হয় ভয়াল আগুনমুখা নদী। একজন ডাক্তারের কাছে পৌঁছানোর সেই যাত্রা অনেক সময় হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।

‎‎জটিল রোগের চিকিৎসা তো দূরের কথা, গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশনের মতো কোনো ব্যবস্থাও নেই এই উপজেলায়। ফলে গর্ভবতী নারী, নবজাতক কিংবা মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে নদীপথে যেতে হয় পার্শ্ববর্তী গলাচিপা অথবা কলাপাড়া উপজেলার সরকারি হাসপাতালে। আর জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে যেতে হয় জেলা সদর পটুয়াখালী কিংবা বিভাগীয় শহর বরিশালে।

‎‎কিন্তু নৌ-যোগাযোগ দিনের বেলায় সীমিত থাকলেও সন্ধ্যার পর প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে দিনেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন লঞ্চ স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছানোই হয়ে ওঠে কঠিন। অনেক সময় রোগীদের ঘর থেকে বের করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। ‎ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার, হেকিম-কবিরাজ কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু এসব জায়গায় জ্বর, সর্দি-কাশির মতো প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া উন্নত কোনো চিকিৎসা সুবিধা নেই।

‎‎২০১২ সালে রাঙ্গাবালী উপজেলা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এখানে গড়ে ওঠেনি একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে নতুন আশার আলো দেখেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ‎‎কিন্তু সেই আশাও এখন অনেকটাই থমকে গেছে। প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট সংকটের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অর্ধনির্মিত হাসপাতাল ভবনটি যেন রাঙ্গাবালীর মানুষের স্বাস্থ্যবঞ্চনার এক নীরব প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সরজমিন দেখা গেছে, দৃশ্যমান কাজের মধ্যে চারতলা হাসপাতাল ভবনের তিনটি ছাদ এবং নিচতলার আংশিক কিছু ওয়ালের কাজ শেষ করা হয়েছে। এছাড়া দুটি কোয়ার্টার ভবন ও একটি সাব-স্টেশন, চলাচলের পথ, বাউন্ডারি ওয়ালসহ বেশকিছু কাজ আংশিক করে বাকিটা বন্ধ রয়েছে। বাইরের অংশে থাকা লোহার রডগুলোয় মরিচা ধরে ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে। প্রতিটি তলায় ভিম-কলামের ঢালাইকাজে পরিপূর্ণ ভাইব্রেশন না হওয়ায় ফাঁকা স্থানে পরে প্লাস্টার করা হয়। দৃশ্যমান ইটের গাঁথুনিতে নিম্নমানের ইট, যে কেউ দেখে বুঝতে পারবে। ভবনের নিচে পাইলিং থেকে প্রথম তলার ফ্লোর পর্যন্ত ফাঁকা জায়গায় বালি ভরাট করা হয়নি। এছাড়াও সাব-স্টেশন ও কোয়ার্টার ভবনের শুধু সিঁড়িসহ কিছু আংশিক কাজ করে বাকিটা পড়ে রয়েছে।

‎‎স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাঙ্গাবালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপের কার্যাদেশ মূল্য ১২ কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর দ্বিতীয় ধাপের কার্যাদেশ মূল্য ধরা হয় ৮ কোটি ১৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। প্রথম ধাপে যৌথভাবে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবুল কালাম আজাদ ও প্রাইম কনস্ট্রাকশন। দ্বিতীয় ধাপের কাজটি পায় আবুল কালাম আজাদ, প্রাইম কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স আয়ান এন্টারপ্রাইজ। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল কার্যাদেশ পাওয়া কাজ দুটির মেয়াদ ছিল এক বছর। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এক বছরের সময়সীমায় প্রথম ধাপে ভৌত অবকাঠামো কাজ শেষ হয় ৫৩ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপের কাজ শেষ হয়েছে ৫৭ শতাংশ। এর অনুকূলে সমপরিমাণ অর্থও তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে গত বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে।

‎‎ দ্রুত এই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ করে কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় দ্রুত প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু হবে এবং দ্বীপবাসী পাবে ন্যুনতম স্বাস্থ্যসেবা।

‎‎এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী হাইয়ে মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহেলা পারভীন বলেন, আমাদের এই উপজেলাটি ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত এখানে একটি সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। ২০২৩ সালে একটি সরকারি হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হলেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে কাজটি বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। চিকিৎসা সেবা পেতে রোগীদের গলাচিপা বা পটুয়াখালীতে যেতে হচ্ছে, যা অনেকের জন্য সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও গুরুতর রোগীদের যাতায়াতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, এমনকি পথে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তাই সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের জোর দাবি, দ্রুত হাসপাতালটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করে তা সম্পন্ন করা হোক, যাতে এলাকার সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা সহজেই পেতে পারেন।

বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার হোসেন আহমেদ বলেন, “এ এলাকার মানুষ এখনো আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে জ্বর, সর্দি-কাশির মতো প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া উন্নত চিকিৎসা নেই। অনেক গর্ভবতী মা সিজারের জন্য যাওয়ার পথে মারা যান। সাপে কামড়ানো রোগীদের জন্য এন্টিভেনম না থাকায় অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ করে কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।”

‎এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আঃ রহমান ফরাজি বলেন, রাঙ্গাবালীবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি হাসপাতাল খুবই জরুরি। ২০২৩ সালে কাজ শুরু হওয়া ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অবহেলিত রাঙ্গাবালীর ২ লাখ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের বিষয়টি নিয়ে আমি এমপি মহাদয়ের  সাথে কথা বলেছি। মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি গত সপ্তাহে রাঙ্গাবালীতে গিয়েছিলাম। এখানে একটি হাসপাতাল অত্যন্ত জরুরি। বিগত সরকারের আমলে কাজটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন একনেকে অনুমোদন হয়েছে। আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত কাজ শুরু হবে এবং ২০২৭ সালের দিকে হাসপাতালটি বুঝিয়ে দিতে পারব।

‎এ বিষয়ে পটুয়াখালী সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে গত মাসে প্রকল্পটি একনেকে আবার নতুন করে পাস হয়েছে। বর্তমানে নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে। ঠিকাদার নিয়োগের পর এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই হাসপাতালটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে।

‎এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ ভূঞা বলেন, টিপিবি পাস হয়েছে। হাসপাতালটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঠিকাদার নিয়োগ হলে পুনরায় কাজ শুরু হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ