মিঠাপুকুর থানার ওসি নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দূর্নীতির পাহাড়: জিরো টলারেন্সের আড়ালে ‘ঘুষ ও জুয়ার রাজত্ব’
মিঠাপুকুর থানার ওসি নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দূর্নীতির পাহাড়: জিরো টলারেন্সের আড়ালে ‘ঘুষ ও জুয়ার রাজত্ব’
রংপুর প্রতিনিধি:
থানায় মামলা করতে কোনো টাকা লাগে না—মিঠাপুকুর থানার এমন ‘সাদা মনের’ প্রচারণা চালালেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামানের যোগদানের পর থেকে থানায় চলছে মাদক, জুয়া আর ঘুষের মহোৎসব। নিজেকে ‘ফেরেস্তা’ দাবি করে প্রচারণা চালালেও পর্দার আড়ালে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো থানার অর্থ-বাণিজ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে , গত বছরের ১১ ডিসেম্বর যোগদানের পর থেকেই মিঠাপুকুর থানায় মামলা রেকর্ড করা সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ৬৫-৭০টি মামলা রেকর্ড হতো, ওসির অনৈতিক আবদারে তা এখন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ডিসেম্বরে ২৩টি, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩০টি এবং ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২৯টি মামলা রেকর্ড করেছেন ওসি নুরুজ্জামান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি মামলা রেকর্ড করতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। ওসি সরাসরি টাকা হাতে না নিলেও তার আস্থভাজন কয়েকজন এসআই-এর মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করা হয়। টাকা দিলে রাতের আঁধারেও মামলা হয়, আর না দিলে অভিযোগ পড়ে থাকে দিনের পর দিন। ফলে নিরুপায় হয়ে মানুষ এখন আদালতের দিকে ঝুঁকছে, যা সাধারণ মানুষের হয়রানি ও মামলার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যোগদানের পর মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা দিলেও বাস্তবে মিঠাপুকুর এখন অপরাধীদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য। স্থানীয় সংবাদকর্মী শাহালম জানান, তার নিজ এলাকা বলদিপুকুর হিন্দুপাড়ায় প্যান্ডেল টানিয়ে দীর্ঘ দেড় মাস ধরে জুয়ার আসর (ডাবু) চলছে। সেখানে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মোটরসাইকেল ও কার নিয়ে জুয়াড়িরা আসে।
এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের নিয়ে আমি নিজেই জুয়ার বোর্ড ভেঙে দিই এবং দুটি মোটরসাইকেল পুলিশে দিই। কিন্তু ওসিকে বারবার ফোন দিলেও তিনি ব্যবস্থা নেননি, উল্টো জুয়ার বোর্ড ভেঙে দিতে গিয়ে জানতে পারি থানার সঙ্গে চুক্তিতে এখানে প্রতিদিন অর্ধ কোটি টাকার জুয়া (ডাবু) খেলা চলতো।" অভিযোগ উঠেছে, জুয়ার বোর্ড থেকে ওসি নুরুজ্জামান গড়ে প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নিচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন অবৈধ বালুর পয়েন্ট থেকে চাঁদা সহ রাতে অবৈধ বালু বহনকারী ড্রাম ট্রাকগুলো থেকেও নিয়মিত বড় অংকের টাকা তার পকেটে যাচ্ছে।
ওসির অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বললেই সংবাদকর্মীদের ওপর নেমে আসে খড়গ। স্থানীয় সাংবাদকর্মী রুকনুজ্জামান রুবেল এবং মিল্লাত হাসান বলেন,আমাদের এক নিকটাত্মীয়র অনুরোধে থানায় গিয়ে ওসির রোষানলে পড়ি। হঠাৎ সাংবাদিক সম্পর্কে ওসি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য শুরু করেন এবং বলেন,আমার থানায় সাংবাদিকদের আসা নিষেধ।
জানা গেছে, রংপুর জেলা এসপি মারুফাত হুসাইনের বিশেষ আনুকূল্য পাওয়ার কারণে তিনি কাউকে তোয়াক্কা করছেন না। উল্লেখ্য, এসপি মারুফাত হুসাইন দিনাজপুর থাকাকালীন নুরুজ্জামান সেখানে কোতোয়ালি থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই ‘বিশেষ সম্পর্কই’ তাকে বেপরোয়া করে তুলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, ছুটিতে নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গেলে ঘুষের টাকায় ঘনঘন রাজকীয় ‘পিকনিক পার্টি’র আয়োজন করেন ওসি নুরুজ্জামান। চাঞ্চল্যকর তথ্য এই যে, ছাত্রজনতাকে হত্যার নির্দেশদাতা ও সাজাপ্রাপ্ত পলাতক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামের সাথে সখ্যতার কারণে ওসি নুরুজ্জামানের ছোট ভাই (পুলিশ কনস্টেবল) ইতিপূর্বে চাকুরীচ্যুত হয়েছেন।
এবিষয়ে অভিযুক্ত (ওসি) মোঃ নুরুজ্জামান বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করলেও বেশকিছু বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেছেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স