মৌলভীবাজার: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপার বিস্ময়ে গড়া এক অনন্য জনপদ
মৌলভীবাজার: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপার বিস্ময়ে গড়া এক অনন্য জনপদ
এস. এম. জালাল উদদীন, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সবুজে মোড়া জনপদ মৌলভীবাজার কেবল একটি প্রশাসনিক জেলা নয়, এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও প্রকৃতির সম্মিলিত এক জীবন্ত দলিল।
চা-বাগানের ঢেউ, পাহাড়ি টিলা, হাওর-বিল আর নদীবিধৌত ভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সহস্র বছরের ঐতিহ্য।
প্রাচীন ইতিহাসের আলোকধারা
প্রাচীন কামরূপ ও ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হিসেবে এই অঞ্চল বহু আগে থেকেই জনবসতিপূর্ণ ছিল।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, বর্তমান মণু নদীর তীরে সাধনা করতেন ‘মণু’। বরবক্র, মণু ও খোয়াই নদীকে ঘিরেই গড়ে ওঠে জনপদ ও তীর্থকেন্দ্র। রামায়ণ ও মহাভারতের উল্লেখ এই অঞ্চলের প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য দেয়।
চতুর্দশ শতকে আরবের ইয়েমেন থেকে আগত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল-এর আগমনের পর সিলেট অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। তাঁর সঙ্গী হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা মৌলভীবাজার এলাকায় ইসলাম প্রচার করেন। তাঁর মাজার আজও শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শন।
মোগল, ব্রিটিশ ও প্রশাসনিক বিকাশ
মোগল আমলে অঞ্চলটি সামরিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খাজা ওসমানের শাসন, পরবর্তীতে মোগল সেনাপতি ইসলাম খানের অভিযান, এই ভূখণ্ডকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত করে।
১৭৫৭ সালের পলাশীর পর ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে জমিদারি প্রথা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রজাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে লাতু অঞ্চলে বিদ্রোহী সিপাহীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯৬০ সালে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার নামকরণ হয় মৌলভীবাজার মহকুমা। অবশেষে ১৯৮৪ সালে এটি জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে জেলার সাতটি উপজেলা—সদর, শ্রীমঙ্গল, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা, কমলগঞ্জ ও জুড়ী—মিলে এক বৈচিত্র্যময় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
নামকরণের পেছনের গল্প
জনশ্রুতি আছে, হযরত শাহ মোস্তফা (রঃ)-এর বংশধর মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদীর তীরে একটি বাজার স্থাপন করেন। ‘মৌলভী সাহেবের বাজার’ থেকেই ক্রমে নামটি রূপ নেয় মৌলভীবাজারে।
চায়ের রাজধানী ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
মৌলভীবাজারকে বলা হয় ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ’। দেশের মোট চা উৎপাদনের বড় অংশ আসে এখানকার ৯৩টি চা-বাগান থেকে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল আজ ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত।
বড়লেখার আগর-আতর শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম কুড়িয়েছে। পাশাপাশি রাবার, আনারস, লেবু, বনজ সম্পদ ও গ্যাসক্ষেত্র জেলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
পর্যটনের অপার সম্ভার
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জেলায় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত প্রতিবছর হাজারো পর্যটক টানে। কমলগঞ্জের হামহাম জলপ্রপাত এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য।
এ ছাড়া লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান-এর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরহরিৎ বন, হাকালুকি হাওর-এর বিস্তীর্ণ জলরাশি, মাধবপুর লেক, বাইক্কা বিল, কমলা রানীর দিঘি—সব মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি এক স্বর্গভূমি।
কৃতি সন্তান ও আন্দোলনের ইতিহাস:
উনবিংশ ও বিংশ শতকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে মৌলভীবাজারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সৈয়দ আব্দুল মজিদ সিআইই কাপ্তান মিয়া, মৌলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনীসহ বহু নেতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ভানুবিল কৃষক বিদ্রোহ প্রজাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বৈচিত্র্যে ভরা সাত উপজেলা
চা-বাগানের সারি, খাসিয়া পানপুঞ্জি, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, হাওরের জীবনযাপন—সব মিলিয়ে জেলার প্রতিটি উপজেলা নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বহন করে। প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনধারা এখানে এক সুতোয় গাঁথা।
সবকিছু মিলিয়ে মৌলভীবাজার কেবল একটি জেলা নয়; এটি এক চলমান ইতিহাস, এক জীবন্ত ঐতিহ্য, আর এক অনন্ত সবুজের গল্প। বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্রে যেমন এর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইতিহাসের পাতায়ও এর অবস্থান গৌরবময় ও অনন্য।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স