মো. আজিজার রহমান, খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
রাত পোহালেই বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় শেষ হয়েছে সব ধরনের প্রস্তুতি। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৫২টি ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে সব কেন্দ্রে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর থেকে উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ছিল সরগরম। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রিজাইডিং অফিসাররা উপস্থিত হয়ে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স, সিল, স্ট্যাম্প, ভোটার তালিকা, ফলাফল শিটসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বুঝে নেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এসব সরঞ্জাম সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পাঠানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দিন শেষে সব কেন্দ্রেই সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা নিজ নিজ কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন।
দিনাজপুর-৪ আসনে ৪ প্রার্থী লড়াই করছেন। তারা হলেন- বিএনপি থেকে ধানের শীষের মনোনয়ন দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়াকে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লার মনোনয়ন দিয়েছে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির মো. আফতাব উদ্দিন মোল্লাকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখার মাওলানা মো. আনোয়ার হোসাইন নদভী এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে লাঙল মার্কার শাহ মো. নুরুল আমিন শাহকে।
খানসামা উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭৭ হাজার ৫২২ জন, মহিলা ভোটার ৭৬ হাজার ৪৩৬ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ জন। বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে বহুমাত্রিক প্রস্তুতি। ভোটারদের নিরাপদ পরিবেশে কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপজেলায় মোতায়েন থাকবে দুই প্লাটুন বিজিবি, তিন প্লাটুন সেনাবাহিনী এবং এক প্লাটুন ব্যাটালিয়ন আনসার। এছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন ১৩ জন আনসার সদস্য এবং অস্ত্রসহ তিনজন আনসার সদস্য। পুলিশের নিয়মিত টহল ও বিশেষ নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর রিজার্ভ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করবে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা ও সম্ভাব্য স্পর্শকাতর পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক টহলে থাকবে।
উপজেলা প্রশাসন কেন্দ্রগুলোকে ‘রেড, ইয়োলো ও গ্রিন’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনের দিন সার্বিক পরিস্থিতি তদারকিতে একাধিক ভ্রাম্যমাণ টিম মাঠে থাকবে বলে জানা গেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।”
তিনি আরও জানান, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে উপজেলার সর্বত্র উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ ও প্রত্যাশার সুর স্পষ্ট। চায়ের দোকান, হাট-বাজার ও গ্রামীণ আড্ডায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। প্রার্থীরা ইতোমধ্যে প্রচারণা শেষ করে ভোটের দিনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল পর্যন্ত চলবে। ভোট শেষে কেন্দ্রেই গণনা সম্পন্ন করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ৫২টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন ভোটার ও সংশ্লিষ্ট সবার।
সব মিলিয়ে রাত পোহালেই গণতান্ত্রিক উৎসবে অংশ নিতে প্রস্তুত খানসামা উপজেলা। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছবির ক্যাপশন: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোটের জন্য সরঞ্জাম নিয়ে যাচ্ছেন কেন্দ্রে।